মুক্তিযুদ্ধের উপ-সর্বাধিনায়ক এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার, বীর উত্তম মারা গেলেন। পাকিস্তানের উপনিবেশ বিরোধী লড়াইয়ের বীরযোদ্ধার এই প্রয়াণ আমাদের মাথার ওপর থেকে আস্থা ও ভালোবাসার ছায়া সরিয়ে নিয়েছে।
কাকতালীয় ব্যাপার হচ্ছে নতুন প্রজন্মের ভারতীয় ছায়া উপনিবেশবিরোধী সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের শহীদ ওসমান হাদির শেষ কৃত্য আজ অনুষ্ঠিত হলো। সম্প্রতি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে হাদি গুলিবিদ্ধ হয়; আততায়ী তাকে গুলি করে ভারতে পালিয়ে গেছে বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ভারতে বসে পলাতক আওয়ামী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে হাদিকে হত্যার নির্দেশনা দিয়েছিলো। হাদি গুলিবিদ্ধ হবার পর ভারতের শিবসেনারা প্রকাশ্যে উল্লাস প্রকাশ করেছে। ভারতের সাবেক সেনা কর্মকর্তা আরেক জুলাই বিপ্লবী হাসনাতকে হত্যার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রকাশ্যে।
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবে বাংলাদেশের বিপ্লবী তরুণ প্রজন্মকে ভারতের কলকাতা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও দিল্লির জওহরলাল ইউনিভার্সিটির তরুণ প্রজন্ম সমর্থন করেছিলো। কিন্তু ভারতের হিন্দুত্ববাদী জেনেক্স ও সিনিয়র মিলেনিয়ালরা বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবীদের ইসলামপন্থী বলে তকমা দিয়ে চলেছে আজ অব্দি।
উল্লেখ্য যে, ১৯৪৭ সালে স্বতন্ত্র স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মতো রাজনৈতিক নেতাদের কারণে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হবার আগ্রহ প্রকাশ করে। তখন পূর্ব বাংলা পাকিস্তান রাষ্ট্রে যুক্ত হতে বাধ্য হয়। সে সময় ভারতের নেতা জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, আপাতত এটা মেনে নেয়া হলো। কিন্তু পূর্ব বাংলাকে অখণ্ড ভারতের অংশ কল্পনা থেকে দিল্লি কখনোই সরে যায়নি। ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন ভূগোলের পাকিস্তানের উপনিবেশের অধীনে থাকা সার্বভৌমত্বপ্রিয় পূর্ব বাংলার মানুষের পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিলো না। ফলে ভাষা আন্দোলন থেকে গণ আন্দোলন হয়ে রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধের মাঝ দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। এই যুদ্ধে ভারত সহযোগিতা করে। কিন্তু ভারতের আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বলয় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতার পরিবর্তে “লিখে রেখো এক ফোটা দিলেম শিশির বলে” বাংলাদেশে একটি ছায়া উপনিবেশ প্রতিষ্ঠায় মরিয়া সময় কাটিয়েছে।
অবশেষে ভারতের প্রয়াত নেতা প্রণব মুখার্জির আত্মজীবনীতে উনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, কিভাবে উনি ওয়ান ইলেভেনের সময় বাংলাদেশের সেনা প্রধান মইন উ আহমেদ-এর সঙ্গে সমঝোতা করে শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আনেন। শুরু হয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের সরাসরি হস্তক্ষেপ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে দিতে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত পিলখানা হত্যাযজ্ঞে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের খুনেদের উপস্থিতির প্রমাণ প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান থেকে পাওয়া গেছে। মতিঝিলের শাপলা ম্যাসাকার থেকে ইসলামোফোবিয়ার ভারতীয় সংকল্প প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। গ্রেফতার ও গুম থেকে ফিরে আসা মুসল্লিদের বর্ণনায় পাওয়া গেছে; কিভাবে বাংলাদেশের ইন্টেররোগেশন সেলে ভারতীয় সক্রিয়কের উপস্থিতি ছিলো হিন্দি ও বাংলা ভাষায়। ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে বিএনপি ও জামায়াতকে গ্রেফতার, নিপীড়নের মাধ্যমে দূরে রেখে; এরশাদের জাতীয় পার্টিকে গৃহপালিত বিরোধী দল বানাতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আধিকারিক সুজাতা সিং ঢাকায় এসে প্রকাশ্যে সক্রিয় হন। এরপর ২০১৮ সালের লাইলাতুল ইলেকশন (রাতের ভোট) ও ২০২৪ সালের একদলীয় ভোটের আগে ও পরে ভারতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঢাকায় এসে শেখ হাসিনা একমাত্র শেখ হাসিনাতেই তাদের সমর্থন প্রকাশ করেন। ২০১৪ সালে হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদি ভারতের রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলে, ভারতের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘু মুসলমানের ওপর নিগ্রহ শুরু হয়; বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ওপর একই রকম নিগ্রহ শুরু হয়। দাড়ি-টুপিওয়ালা মানুষকে জঙ্গি তকমা দিয়ে হত্যা-গুম; জঙ্গি বিরোধী অভিযানের নাটক সাজিয়ে নির্বিচারে নারী ও শিশু হত্যা চলতে থাকে। নরেন্দ্র মোদী ঢাকা সফরে এলে কুমিল্লায় বিক্ষোভরত অন্ততঃ সতেরোজন কিশোর-তরুণকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয়। ইজরায়েল যেমন প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি তৈরি করেছে; মানবতা লংঘনের একই নকসায় ভারত সৃজন করেছিলো বাংলাদেশ ল্যাবরেটরি।
২০০৯ থেকে বাংলাদেশে মুসলমান পরিচয় ছিলো ঝুঁকিপূর্ণ; নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক মানুষ বলে পরিচয় দিয়ে হিন্দুত্ববাদী চিন্তাকে সন্তুষ্ট করে তবে ভারত সমর্থিত হাসিনার আশীর্বাদ পাওয়া যেতো। বাংলাদেশের বুমারস, জেনেক্স ও সিনিয়র মিলেনিয়ালরা বেশ তাল মিলিয়ে চলেছে এই কালচারাল হেজিমনিতে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু জেনজি কখনোই মেনে নিতে পারে নি এই নিজভূমে পরবাসী হয়ে থাকা। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন হয়ে ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লবে সহস্র প্রাণের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করে।
ভারতের কর্মচারী হাসিনা ঠিকই তার চল্লিশ চোরকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। আর সেখান থেকে অডিও ভাষণের মাধ্যমে বাংলাদেশে হত্যা-নাশকতার উস্কানি ও নির্দেশনা দিতে থাকেন। ভারতের মিডিয়া হিন্দুত্ববাদের গদিতে বসে বাংলাদেশ ইসলামপন্থীদের কবলে বলে মিথ্যাবাদী রাখালের মতো হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক বিশ্ব অবশ্য ভারতীয় মিডিয়ার প্রোপাগাণ্ডা ও ফেক ওয়েবসাইট রিউমার সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশকে নিজস্ব চোখে দেখেছে। ভারতের মিডিয়া বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইউনুসকে “তালিবান” ডেকে নোবেল বিজয়ী ইউনুসের সুকৃতিতে মালিন্য আনতে পারেনি। অন্যদিকে দিল্লি প্রশাসন খোদ আফঘানিস্তানের তালিবান প্রশাসনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজের সাংস্কৃতিক মান ও অবস্থান চিহ্নিত করেছে। হয়তো অন্যকে মিথ্যা তকমা দিলে মানুষ নিজেই তা হয়ে যায় কালক্রমে।
পনেরো বছর ধরে সাজানো ফ্যাসিস্ট হাসিনার পুলিশ-প্রশাসন-সেনাবাহিনী-গোয়েন্দা সংস্থা-মিডিয়া-কালচারাল উইং শেকড় ছড়িয়েছে বাংলাদেশে। এমনকি ইসলামপন্থীদের একটি অংশকেও খাসজমি ও নজরানা দিয়ে ফ্যাসিজমের শোকরানা মেহেফিলে হাজির করা হয়েছিলো। ফলে জুলাই বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়েছে। পলাতক হাসিনা ও তার দোসরদের দেশ লুন্ঠনের লাখ কোটি টাকা ছড়ানো হয়েছে গুপ্ত হত্যা ও নাশকতায়। ভারতে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে টার্গেট কিলিং করে আবার ভারতে পালিয়ে যাবার অবারিত সুযোগে জুলাই বিপ্লবীদের জীবন এখন বিপন্ন। হাদি তার সাম্প্রতিকতম ভিক্টিম। একটি ঘটনা ঘটিয়ে তাতে তৈরি জনবিক্ষোভে সৃষ্ট নৈরাজ্য নিয়ে মরণকান্নার জন্য রয়েছে কালচারাল রুদালি গোষ্ঠী। ফলে আওয়ামী লীগের মরেও কাঁদা আবার মেরেও কাঁদা আলেখ্য “কাঁদো বাঙালি কাঁদো” মঞ্চস্থ হয় নিয়মিত।
বাংলাদেশে ভারতের ছায়া উপনিবেশ হবার উদগ্র আকাংক্ষাকে সেখানকার তরুণ প্রজন্ম অপছন্দ করে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত বয়েসীরা; তারা হিন্দুত্ববাদী না হয়ে প্রগতিশীল হলেও; চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের হিন্দু জমিদারের ভঙ্গিতে দেখেন বাংলাদেশ বাস্তবতাকে। তাই তো কৃষক প্রজার মৃত্যুর চেয়ে বিক্ষুব্ধ কৃষক প্রজার ঢিলে জমিদার বাড়ির ঝাড়বাতি ভেঙ্গে যাওয়া নিয়ে তারা বেশী বিপন্ন বোধ করেন।
ভারতের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘু মুসলমান হত্যা-নির্যাতনের বিষয়টিকে সেদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে বাংলাদেশের মুসলমানেরা। কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের অভিভাবক হয়ে বসে আছেন ভারতের হিন্দুরা। প্রতিদিন ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা পাখির মতো গুলি করে মারে বাংলাদেশের নাগরিকদের। কিন্তু মৃতদেহের ধর্ম বিবেচনা করে অনুশীলিত নির্লিপ্ততায় তখন সোনালি নীরবতায় শিল্প-সাহিত্যের সাধনা করেন কলকাতার সংস্কৃতি মামা ও খালা। ঠিক ঐ মডেলে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি মামা ও খালা। হাদির মৃত্যুতে অনুশীলিত নির্লিপ্ততায় শিল্প সাধনা; আর হাদির মৃত্যুতে বিক্ষুব্ধ জনতার উচ্ছৃংখলায় ভেঙ্গে যাওয়া হারমোনিয়াম নিয়ে কেঁদে উথাল পাথাল হন তারা। এমন পরাবাস্তব শিল্পবোধ কেবল দুই বাংলাতেই সম্ভব।
বাংলাদেশের মানুষ সতত সার্বভৌমত্বপ্রিয়। বৃটিশ-পাকিস্তান উপনিবেশ উপড়ে ফেলতে তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। সুতরাং নতুন করে ভারতীয় ছায়া উপনিবেশ মেনে নেয়া অসম্ভব তাদের পক্ষে। বাংলাদেশের মানুষ সহজ সরল আতিথেয়তাপ্রবণ নদীমানুষ। সে সেরা বন্ধু হতে পারে; কিন্তু দাস হতে পারবে না কারো। সম্পন্ন কৃষক-কারিগরের মুক্তজীবনের অস্থিধারণ করে যে জনপদের মানস গঠন হয়েছে; তাকে সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সের হেজিমনির শেকলে বাঁধা অসম্ভব। ওসমান হাদির মতো তরুণ তাই জীবন সায়াহ্নে কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার আবৃত্তিতে খুঁজেছিলো সার্বভৌমত্ব ও আত্মপরিচয় বিনির্মাণের অজর প্রতিজ্ঞা।
আমরাই হাদি
- Advertisement -





