খুচরা বাজারে আয়োডিনযুক্ত বলে নানা কোম্পানির প্যাকেটজাত ভেজাল ভোজ্য লবণ বিক্রি হচ্ছে। চাষিদের কাছ থেকে কেজি ছয়-সাত টাকা দরে কিনে প্যাকেটজাত করে আয়োডিনযুক্ত বলে চড়া দামে বিক্রি চলছে। দেশে ২৫০টি লবণ মিলের মধ্যে সাতটি ভ্যাকুয়াম প্রযুক্তির। বাকিগুলো মেকানিক্যাল ও সনাতন পদ্ধতির। কিন্তু দুই শতাধিক মিল আয়োডিনযুক্ত ভোজ্য লবণ বাজারজাত করতে বিসিক থেকে নিবন্ধন নিয়েছে। এসব মিলে উত্পাদিত ভেজাল ভোজ্য লবণ খুচরা বাজারে দেদার বিক্রি চলছে। এতে জনস্বাস্থ্য চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। প্রসঙ্গত, দেশে বছরে প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্য লবণের চাহিদা রয়েছে।
সম্প্রতি সময়ে চট্টগ্রামে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইয়ের অভিযানে বিভিন্ন কোম্পানির আয়োডিনবিহীন প্যাকেটজাত ভোজ্য লবণের সন্ধান পেয়েছে। কিছু অসাধু লবণ মিল মালিক এই ধরনের ভেজাল ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। এসব ভেজাল লবণ চড়া দামে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করেছে ব্যবসায়ীরা। ক্রেতারাও নিরাপদ মনে করে এসব লবণ কিনে নিচ্ছে।
লবণের ন্যায্যমূল্য পায় না প্রান্তিক চাষিরা। চাষিরা কঠোর পরিশ্রম করে লবণ উত্পাদন করলেও তার প্রতি মণ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি বিক্রি করতে পারে না। মিল মালিকরা চাষিদের কাছ থেকে পানির দরে লবণ কিনে বাজারে চকচকে প্যাকেট করে চড়া দামে বিক্রি করছে। বর্তমানে খুচরা বাজারে ভ্যাকুয়াম ফ্যাক্টরির ব্যান্ডের প্যাকেটজাত লবণ কেজি ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু খুচরা বাজারের অন্যান্য কোম্পানির প্যাকেটজাত লবণ কেজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকাও বিক্রি হচ্ছে। এতে দেখা যাচ্ছে কেজি ছয়-সাত টাকা দরে কেনা লবণ প্যাকেটজাত করে আয়োডিনযুক্ত বলে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। এসব প্যাকেটজাত লবণে আয়োডিনযুক্ত রয়েছে কি না, তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ রয়েছে।
বিসিক ও লবণ মিল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে ২৫০টি লবণ মিল রয়েছে। তার মধ্যে ভ্যাকুয়াম, মেকনিক্যাল ও সনাতন তিন ধরনের লবণ মিল রয়েছে। ভ্যাকুয়াম ফ্যাক্টরিগুলো উন্নত প্রযুক্তিযুক্ত। ভ্যাকুয়াম প্রযুক্তি লবণ ফ্যাক্টরি মাত্র কয়েকটি। অধিকাংশই লবণ মিল মেকানিক্যাল ও সনাতন পদ্ধতিতে লবণ প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত বিক্রি করছে। ভ্যাকুয়াম ফ্যাক্টরির বাজারজাত ভোজ্য লবণ নিয়ে কোনো অভিযোগ না থাকলেও অন্যান্য ফ্যাক্টরির প্যাকেটজাত ভোজ্য লবণে আয়োডিনযুক্ত করা নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। পর্যাপ্ত আয়োডিনযুক্ত না করায় বা একেবারে আয়োডিন না মিশানোর কারণে বাজারের এসব লবণ খেয়ে মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নূরুল কবির বলেন, চট্টগ্রামে দুইটি ভ্যাকুয়াম ফ্যাক্টরি রয়েছে। এই দুটি ফ্যাক্টরির ভোজ্য লবণ গুণমানসম্পন্ন। বাকিগুলো মেকানিক্যাল ও সনাতন পদ্ধতির ফ্যাক্টরি। এগুলোর ভোজ্য লবণে আয়োডিনযুক্ত নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।’
বিসিক প্রধান কার্যালয়ের লবণ সেলের ডিজিএম সারোয়ার হোসেন বলেন, দেশে ভ্যাকুয়াম ফ্যাক্টরি রয়েছে সাতটি। বাকিগুলো মেকানিক্যাল ফ্যাক্টরি। ভোজ্য ও শিল্প দুই ধরনের লবণ বিক্রি হয়। শিল্প লবণে আয়োডিনযুক্ত করতে হয় না। কক্সবাজার, বাঁশখালীসহ কিছু জায়গায় মানুষ খোলা লবণ খেয়ে থাকেন। আমরা এ ব্যাপারে সচেতনতামূলক প্রচারণা করেছি। শিল্পে লবণের চাহিদা আগের চেয়ে কমে গেছে। শিল্পে উত্পাদন কম হওয়ায় লবণের চাহিদাও কমে গেছে। এতে বর্তমানে শিল্প লবণের দাম কমে গেছে। বর্তমানে প্রতি মণ ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের কাছে ১৬-১৭ মেট্রিক টন আয়োডিন মজুত রয়েছে।’
বিসিক চট্টগ্রাম কার্যালয় জানায়, যেসব লবণ মিল আয়োডিনযুক্ত প্যাকেটজাত ভোজ্য লবণ বিক্রি করবে তাদের বিসিক থেকে ভোজ্য লবণের নিবন্ধন নিতে হবে। পরে এসব মিল মালিককে বিসিক থেকে আয়োডিন ক্রয় করতে হবে। চট্টগ্রামের মাঝিরঘাট, রাজাখালী, বোয়ালখালী, পটিয়া, বাঁশখালী ও কক্সবাজার মিলিয়ে প্যাকেটজাত ভোজ্য লবণ বিক্রির জন্য ১৬০টি লবণ মিল বিসিক থেকে ভোজ্য লবণের নিবন্ধন নিয়েছে। এসবের মধ্যে দুইটি মাত্র ভ্যাকুয়াম ফ্যাক্টরি রয়েছে।
বিসিক সূত্র জানায়, দেশে বছরে প্রায় ৬০ মেট্রিক টন আয়োডিনের প্রয়োজন। বিসিক এসব আয়োডিন আমদানি করে থাকেন। ১ হাজার কেজি লবণে ৭০ গ্রাম আয়োডিন মেশাতে হয়। আর ১৫ টনে ১ কেজি আয়োডিনযুক্ত করার বাধ্যবাদকতা রয়েছে। এক কেজি আয়োডিনের মূল্য ১০ হাজার ৫০০ টাকা। আয়োডিনের পরিমাণ সামান্য হলেও মেকানিক্যাল ও সনাতন পদ্ধতির ফ্যাক্টরিগুলোতে আয়োডিনবিহীন ভোজ্য লবণ বিক্রির প্রমাণ বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
বিসিক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, প্রতি মাসে বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আমাদের নিজস্ব ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়। যেসব প্যাকেটজাত লবণে ত্রুটি পাওয়া যায় তাদের সতর্ক করা হয়। পুনরায় প্রমাণ পেলে নিবন্ধন বাতিল করা হয়। বিসিকের আয়োডিনের কোনো ঘাটতি নেই।’
কক্সবাজারে ৮৪টি লবণ মিল রয়েছে। তার মধ্যে ৫৬টি লবণ মিল ভোজ্য লবণের নিবন্ধন নিয়েছে। এ ব্যাপারে বিসিক কক্সবাজার কার্যালয়ের ডিজিএম জাফর ইকবাল ভুঁইয়া বলেন, এখানে ভ্যাকুয়াম কোনো ফ্যাক্টরি নেই। সবগুলো মেকানিক্যাল ও সনাতন পদ্ধতির ফ্যাক্টরি। প্যাকেটজাত ভোজ্য লবণে আয়োডিন মিশ্রণ না করা নিয়ে কিছু অভিযোগ পাওয়া যায়। ত্রুটি পেলে সতর্ক করে দেওয়া হয়।’







