আফ্রিকার দীর্ঘদেহী একজন মানুষের জামা বাংলাদেশের স্বাভাবিক গড়নের কোনো মানুষের গায়ে লাগবে না। প্রতিটি মানুষকে তার শরীরের আকার অনুযায়ী পোশাক কিনতে হয়। রাজনীতিতেও একই কথা। আফ্রিকা-আমেরিকা-ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের মডেলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করা হলে সেটি ব্যর্থ হবে। ওইসব দেশে যে মডেলে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশে সেই মডেল কার্যকর নাও হতে পারে।
বাংলাদেশের জলবায়ু ও আবহাওয়া, এখানের মানুষের মানসিক গড়ন, চিন্তা ও বোধ, দর্শন, শিক্ষা ও সচেতনতার মাত্রা, প্রযুক্তির ব্যবহারে অভ্যস্ততা—সবকিছু্ই ভিন্ন। এখানে নাইজেরিয়ার মডেল যেমন কাজ করবে না, তেমনি নরওয়ের মডেলও নয়। বাংলাদেশকে চলতে হবে তার নিজস্ব মডেলে। এখানের রাজনীতি চলবে এখানের মানুষের আদলে। নির্বাচনি ব্যবস্থাটিও সেরকম।
প্রশ্নটা উঠেছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টারের ব্যবহার না থাকার বিষয়ে। বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে পোস্টারের ব্যবহার থাকছে না। তিনি বলেন, ‘বিলবোর্ডের ব্যবহার অতীতে ছিল না, এটা ইন করা হচ্ছে।’ ব্যানার, ফেস্টুন ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, এসব বিষয়কেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রচার-প্রচারণায় পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারের ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে। ভোটার স্লিপ ইন্ট্রোডিউস করার ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। টি-শার্ট, জ্যাকেট ইত্যাদির ব্যাপারে যে অতীতে বিধিনিষেধ ছিল, এ ব্যাপারে একটু শিথিল মনোভাব পোষণ করা হয়েছে।’
গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদেনও পোস্টারের ব্যবহার বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ৮.৫ নম্বর পয়েন্টে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনি আচরণবিধি (ক) ব্যানার, তোরণ ও পোস্টারের পরিবর্তে লিফলেট, ভোটার-প্রার্থী মুখোমুখি অনুষ্ঠান, পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ও সরকারি গণমাধ্যমে প্রচারের সম-সুযোগ প্রদানের বিধান করা উচিত’। (নিবাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন, পৃষ্ঠা ২০, ফেব্রুয়রি ২০২৫)।
তার মানে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ আমলেই নিয়েই নির্বাচনে পোস্টার বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। প্রশ্ন হলো, এর সুবিধা-অসুবিধা কী?
প্রসঙ্গত, নবম সংসদে ২০১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে যখন ‘দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন’ পাসের জন্য বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন তৎকালীন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, তখন তিনি রসিকতা করে বলছিলেন, ‘সারা জীবন পোস্টার লাগালাম, আর এখন পোস্টার নিয়ন্ত্রণ আইন করতে হচ্ছে’। সংসদের মাইক্রোফোন অন থাকায় তার এই কথাটি সংসদের গ্যালারিতে থাকা সাংবাদিকরাও শুনতে পান এবং এটা নিয়ে বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। বিলটি নিয়ে সংসদে কোনো বিতর্ক হয়নি। কারণ বিলে সংশোধনী দিয়েছিলেন মাত্র একজন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ফজলুল আজিম। কিন্তু তিনিও সংশোধনী সম্পর্কে বক্তব্য না রাখায় বিলটি দ্রুততম সময়ে পাস হয়ে যায়।
রাস্তায় চলার পথে শহরের দেয়ালে বিচিত্র সব মানুষ ও বিষয়ের পোস্টার চোখে পড়ে। নেতাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে রাজনৈতিক পোস্টার; নির্বাচনি পোস্টার; ঈদ বা এরকম উৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টার; বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন; হারবাল ওষুধ ও তান্ত্রিক ওঝার বিজ্ঞাপন; বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ইত্যাদি। কখনো দেখা যায় কোনো একজন ব্যক্তির ছবি দিয়ে তার গলার কাছে ফাঁসির রসি এঁকে লেখা থাকে, অমুকের হত্যার জন্য দায়ী তমুকের ফাঁসি চাই। লাখ লাখ মানুষের কাছে তাকে খুনি হিসেবে হাজির করা হয়। অনেক সময় এসব পোস্টার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেও ছাপানো হয়। বাস্তবে হয়তো ওই লোক খুনের সাথে জড়িতই নন। অথচ হাজার হাজার পোস্টার ছাপিয়ে সামাজিকভাবে তাকে হেয় করা হয়। কিন্তু এর কোনো প্রতিকার নেই। নিয়ন্ত্রণ নেই। চাইলেই যেকেউ যেকোনো বিষয়ে পোস্টার ছেপে তা দিয়ে শহর ছেয়ে ফেলতে পারেন।
বাসাবাড়ি ও অফিসের দেয়াল, বিদ্যুতের খুঁটি, ঐতিহাসিক স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দেয়ালও এই পোস্টারসন্ত্রাসের হাত থেকে মুক্তি পায় না। রাজধানীর যেসব এলাকায় কোচিং সেন্টার বেশি, যেমন ফার্মগেট, সেসব এলাকায় ব্যাচেলরদের জন্য ঘর ভাড়া এবং কোচিং সেন্টারের পোস্টার ও ব্যানার যে কতটা অনিয়ন্ত্রিত হতে পারে, তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এসব পোস্টার ও ব্যানার সাঁটানো হয়, সেসব উদ্দেশ্য বা কাজ শেষ হয়ে গেলেও পোস্টার ও ব্যানার সরানো হয় না। বছরের পর বছর সেগুলো দেয়ালে থাকে। আবার সুকান্তের ‘এসেছে নতুন শিশুর মতো’ পুরনো পোস্টারের উপরে সাঁটা হয় নতুন পোস্টার।
আইন কী বলছে? নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোন স্থানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে না। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানোর জন্য প্রশাসনিক আদেশ দ্বারা স্থান নির্ধারণ করে দিতে পারবে এবং নির্ধারিত স্থানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে। তবে শর্ত থাকে যে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে, উল্লিখিত নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে বিধি দ্বারা নির্ধারিত শর্ত ও পদ্ধতিতে এবং নির্দিষ্ট ফি প্রদান সাপেক্ষে, দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে।
কিন্তু কেউ যদি আইন লঙ্ঘন করেন? বলা হয়েছে, এই আইনের বিধান লঙ্ঘন করে দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানোর শাস্তি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কোম্পানির বিরুদ্ধে সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া যাবে। এই আইন লঙ্ঘন করার অভিযোগ পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন, ২০০৯ অনুযায়ী বিচার করা হবে। সুবিধাভোগীর ক্ষেত্রে অভিযোগ পাওয়া গেলে ফৌজদারি বিধি ১৮৯৮ অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার হবে।
তবে শুধু আইনের ব্যত্যয় নয়, এভাবে বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন পোস্টার শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করে; নাগরিকদের মনে বিরক্তির জন্ম দেয় এবং তারও চেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, পোস্টার লাগিয়েই লোকজন নেতা হয়ে যায় অথবা হতে চায়।
অনিয়ন্ত্রিত পোস্টার ও ব্যানার শহরের দৃশ্যদূষণও ঘটায়। আমরা বায়ু ও শব্দ দূষণ নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন বা সরব, এই দৃশ্য দূষণ নিয়ে ততটা নই। এর একটি কারণ হতে পারে এই যে, যেহেতু এসব পোস্টারের অধিকাংশই রাজনৈতিক নেতাদের, এবং আরও পরিস্কার করে বললে যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের নেতা ও পাতিনেতাদের পোস্টারেই দেয়াল ছেয়ে যায়, ফলে কার এমন বুকের পাটা যে এসবের বিরুদ্ধে বলবে? তার চেয়ে বরং বায়ু ও শব্দ দূষণ নিয়ে কথা বলা নিরাপদ।
মানুষ যা দেখে অর্থাৎ তার দৃশ্যসীমায় যা কিছু ধরা দেয়, তার বিষয়বস্তু ও রঙ সরাসরি তার মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। যেমন একটি হাস্যোজ্জ্বল শিশুর বড় পোস্টারে চোখ পড়লে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে আপনার অপছন্দের কোনো লোকের বিশাল ছবিসম্বলিত পোস্টার দেখলেই মেজাজ বিগড়ে যাবে। ফলে দেয়ালে পোস্টার টানানোর বিষয়টিও নগরব্যবস্থাপনার অংশ। কিন্তু এ বিষয়ক আইনের গরু কেতাবে থাকলেও গোয়ালে অনুপস্থিত।
ইসি কেন পোস্টার বাদ দিতে চায়?
নির্বাচন কমিশনার মো. সানাউল্লাহ আাগামী জাতীয় নির্বাচনে পোস্টারের ব্যবহার থাকবে না কমিশনের যে নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন, তাতে অনেকে খুশি হতে পারেন। বিশেষ করে পোস্টারের কারণে পরিবেশ ও দৃশ্যদূষণে যারা বিরক্ত, তারা এটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পোস্টার ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো একটি বিরাট আয়োজনের প্রচারকাজ চালানোর মতো বাস্তবতা কি বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে? পোস্টারের যেসব বিকল্পের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো কি নির্বাচনের খরচ আরও বাড়িয়ে দেবে? পোস্টারের যেসব বিকল্পের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো কি তৃণমূলের সকল প্রার্থী ও ভোটারের জন্য সহজলভ্য?
নির্বাচন কমিশন ঠিক কোন কোন যুক্তিতে নির্বাচনে পোস্টারের ব্যবহার বাদ দিতে চায় এবং এর বিকল্প হিসেবে যেসব পদ্ধতির কথা ইসি ও সংস্কার কমিশন বলছে, সেগুলোর পক্ষে তাদের যুক্তিসমূহ কী—তা এখনও পরিষ্কার নয়। যেহেতু আলোচনাটি শুরু হলো, ফলে আগামী দিনগুলোয় হয়তো তাদের পক্ষ থেকে এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে।
কয়েকটি প্রশ্নের সুরাহা করা দরকার।
১. পোস্টারে পরিবেশ ও দৃশ্যদূষণ হয়, এটা ঠিক। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পোস্টার ছাড়া কীভাবে হাজার হাজার প্রার্থী প্রচার চালাবেন?
২. নির্বাচন কমিশন বলছে, নির্বাচনি প্রচারে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। ধরা যাক একটি আসনে ১০ জন প্রার্থী। একেক প্রার্থী কয়টি করে বিলবোর্ড লাগানোর অনুমতি পাবেন। কোথায় কোথায় এগুলো লাগানো যাবে বা বিলবোর্ডের রঙ ও সাইজ কী হবে? রঙিন পোস্টারে নিষেধাজ্ঞা আছে বলে সাদাকালো পোস্টার ছাপাতে হয়। বিলবোর্ডের ক্ষেত্রেও কি সেরকম বিধিনিষেধ থাকবে?
৩. বিলবোর্ড টানানোর স্থান নির্ধারণ করে দেবে কে এবং এটি নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে যে সংঘাত হবে না, তার নিশ্চয়তা কী? অর্থাৎ যিনি বড় দলের প্রার্থী বা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী, এলাকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানে তিনি যদি বিলবোর্ড টানাতে চান, তাহলে অন্য প্রার্থীরা কী করবেন? এই ইস্যুতে প্রার্থীদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হবে, সেটা কে মীমাংসা করবে?
৪. পোস্টার সাধারণত দড়ি দিয়ে মাথার উপরে টানানো হয়। কিন্তু বিলবোর্ড লাগানোর জন্য প্রচুর জায়গা প্রয়োজন হবে? কার জায়গায় কে বিলবোর্ড বসাবে? দেখা যাবে, ক্ষমতাবান প্রার্থী ঠিকই অন্যের জায়গায় নিজের বিলবোর্ড লাগিয়েছেন। কিন্তু বাকিরা হালে পানি পাবেন না। অর্থাৎ বিলবোর্ড স্থাপন নিয়েই প্রার্থীরা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবেন। তার মানে নির্বাচন কমিশন সচেতনভাবেই পরিবেশ নষ্ট করার একটি পদ্ধতি চালু করতে চাচ্ছে?
৫. পোস্টারের চেয়ে কি বিলবোর্ডে খরচ কম হবে? যদি না হয়, তাহলে ইসি কেন নির্বাচনের খরচ বাড়ানোর পথে হাঁটছে?
৬. কত বর্গকিলোমিটার আয়তনের এলাকায় কতগুলো বিলবোর্ড লাগানো যাবে, তার সীমারেখা না থাকলে নির্বাচনের সময় বিলবোর্ডের কারণে চারিদিকে আর কিছুই চোখে পড়বে না। নির্বাচনি দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিরা এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন? স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী প্রার্থীরা তাদেরকে আদৌ পাত্তা দেবেন?
৭. নির্বাচন কমিশন বলছে, প্রচার-প্রচারণায় পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারের ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে। টি-শার্ট, জ্যাকেট ইত্যাদির ব্যাপারে যে অতীতে বিধিনিষেধ ছিল, এ ব্যাপারে একটু শিথিল মনোভাব পোষণ করা হয়েছে। তার মানে এতদিন প্রার্থীদের দশ হাজার পোস্টার ছাপাতে যে খরচ হতো, এখন তার নিজের ও প্রতীকের ছবিসম্বলিত টি-শার্ট, জ্যাকেট, মগ, ঘড়ি বা এরকম জিনিসপত্র তৈরি করে ভোটারের কাছে পৌঁছে দিতে খরচ হবে কয়েক গুণ। তার মানে ইসি কি নির্বাচনকে বিত্তশালী লোকের প্রতিযোগিতায় পরিণত করতে চায়?
৮. নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশের মধ্যে পোস্টারের বিকল্প হিসেবে লিফলেটের কথা বলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, পোস্টার ও লিফলেটের পার্থক্য কী? পোস্টারের সাইজ হয় বড় এবং এগুলো থাকে মাথার উপরে। এর সুবিধা হলো, পড়ালেখা না জানা মানুষও প্রার্থী ও তার প্রতীকের ছবি দেখে বুঝতে পারে এটা কার পোস্টার। কিন্তু লিফলেট হয় সাধারণত প্রচুর বক্তব্যনির্ভর। তার সাইজ হয় ছোট। যদি কাগজ ও কালির সাশ্রয় এবং পরিবেশ সুরক্ষার উদ্দেশ্য মাথায় রেখেই পোস্টার নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে লিফলেট কেন বৈধ হবে? এটাও তো একধরনের মুদ্রিত জিনিস—যার মূল উপাদান কাগজ ও কালি। উপরন্তু পড়ালেখা না জানা মানুষের কাছে লিফলেটগুলো অপ্রয়োজনীয় কাগজের টুকরো বৈ কিছু নয়।
৯. নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের আরেকটি সুপারিশ হলো ভোটার-প্রার্থী মুখোমুখি অনুষ্ঠান, পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ও সরকারি গণমাধ্যমে প্রচারের সম-সুযোগ প্রদানের বিধান করা। তৃণমূল পর্যায়ে প্রার্থীদের মুখোমুখি অনুষ্ঠানগুলো কে আয়োজন করবে? এখানে প্রার্থীদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে কে? পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের খরচ পোস্টার ও লিফলেটের চেয়ে বেশি। এখানেও পয়সাওয়ালা প্রার্থীরা এগিয়ে থাকবেন। তিনশো আসনে একদিনে ভোট হলে হাজার হাজার প্রার্থীকে কথা বলার জন্য সরকারি গণমাধ্যম, বিশেষ করে বাংলাদেশ টেলিভিশন কী করে সুযোগ দেবে? রাজধানী ঢাকা ও বড় শহরগুলোর বাইরের প্রার্থীরা পাত্তা পাবেন?
১০. পোস্টার না থাকলে প্রার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রচারের সুযোগ নেবেন। যেমন মোবাইলে ফোনে মেসেজ, ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে সেগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার ইত্যাদি। এর মধ্য দিয়ে যাদের হাতে ইন্টারনেট সংযুক্ত স্মার্টফোন আছে, তাদের কাছে পৌঁছানো সহজ হবে। কিন্তু এর বাইরে যে বিপুল সংখ্যক মানুষ ইন্টারনেট সংযুক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না, তাদের কাছে প্রার্থীরা কী করে পৌঁছাবেন? বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকা ও চরাঞ্চলের মানুষের কাছে পোস্টারের চেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী উপকরণ কি আর কিছু আছে?
করণীয় কী?
জাতীয় নির্বাচনের পোস্টারের ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক নিয়ন্ত্রিত। বিশেষ করে পোস্টারের রঙ ও সাইজ নির্ধারণ করে দেওয়া এবং পোস্টার লাগানোর পদ্ধতি উল্লেখ থাকায় পোস্টার নিয়ে নৈরাজ্য অনেক কমেছে। কিন্তু তারপরও এখানে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। যেমন ভোটের পরেও দীর্ঘদিন পোস্টারগুলো ঝুলে থাকে। এগুলো একসময় ছিঁড়ে ছিঁড়ে নদী ও পানিতে পড়ে, ফসলের মাঠ নষ্ট করে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের বিরুদ্ধে জরিমানার ব্যবস্থা রাখলে এই প্রবণতাও কমে আসবে এবং ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু পোস্টারের নৈরাজ্য বন্ধের বিকল্প হিসেবে নির্বাচন কমিশন ও সংস্কার কমিশন যেসব বিকল্পের কথা বলছে, সেগুলো বিশেষ কিছু প্রার্থীকে সুবিধা দিলেও তৃণমূল্যের সকল প্রার্থী এর সুযোগ নিতে পারবেন না। বরং নির্বাচনের টাকার খেলা বন্ধের যে দাবিটা বছরের পর বছর ধরে করা হচ্ছে, সেটি বন্ধের বদলে আরও বাড়তে পারে।
আমীন আল রশীদ
সাংবাদিক ও লেখক
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি আর্কাইভ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
ইসি কেন নির্বাচনে পোস্টার বাদ দিলো?
- Advertisement -





