প্রবাদ আছে: ‘মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি’। অর্থাৎ যখন কোনো ঘটনায় কেউ নিজের দায়িত্ব পালন না করে অন্যের দুঃখে দুঃখিত হওয়ার ভান করে বা অপ্রয়োজনে অন্যের প্রশংসা করে বেড়ায়, তখন বুঝতে হবে সেখানে ‘কিন্তু’ আছে।
সম্প্রতি সরকার রাজস্ব বিভাগের সংস্কারে একটি বড় চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। এর ফলে রাজস্ব বোর্ডে বিলুপ্ত হলো। আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করলাম, কর-কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া, আন্দোলন, কর্মবিরতি। কারণ তারা মনে করে আসছিলেন, সংক্ষিপ্ত জীবনে রাজস্ব বিভাগের চাকরি পাওয়া মহা সৌভাগ্যের। এখানে আলাদিনের চেরাগ পাওয়া আছে। আবার এই পেশার লোকজন অনেক সময় নিজেদের ‘জমিদার’ ভাবেন। কিন্তু যুগ যে পরিবর্তন হয়েছে, সেদিকে নজর রাখলে ভালো হয়।
তারা এতটা জনদরদী হয়েছেন যে, দেশের প্রথম শ্রেণির সকল অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের সুপারিশ উপেক্ষা করে নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠা করতে বেশি আগ্রহী। সরকারগুলোকে জিম্মি করে বা অতি তোষামদি করে বিগত অধ্যাদেশ ও আইনগুলো একান্ত নিজেদের মতো করে তৈরি করতে পারলেও এবার তা পারেননি। তাদের সৌভাগ্য যে, কমিটি অনুরূপ কর্মের শাস্তির সুপারিশ করেনি। তাহলে রাস্তায় বিক্ষোভ তো দূরের কথা, এর বিরোধিতা করলে চাকরিও চলে যেতে পারতো।
এনবিআর সংস্কারে অধ্যাদেশ জারির ফলে কী ঘটলো?
সরকার এনবিআর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বিলুপ্ত করে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে গত ১৩ মে। এর ফলে করনীতি ও কর ব্যবস্থাপনা নামে দুটি বিভাগ সৃষ্টি হয়। এই দুটি বিভাগের নতুন কার্যক্রমও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এই দুটি বিভাগ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করবে বলে নির্ধারণ করা হয়।
দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদরা রাজস্ব সংস্কারের এই উদ্যোগকে দুয়েকটি ত্রুটি ছাড়া অনেকাংশই সাধুবাদ জানিয়েছেন। আধুনিক কর ব্যবস্থাপনার জন্য এই সংস্কার অতীব জরুরি ছিল। বিজ্ঞজনের মতে, এর ফলে প্রশাসনের আধুনিকীরণ হবে। একইসাথে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও আদায়ে নতুন অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কর্মকর্তারা অধিকতর দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন।
অধ্যাদেশ মোতাবেক, রাজস্ব নীতি বিভাগ কর আইন প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ করার দায়িত্বে থাকবে। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টিকে প্রধান্য দিয়ে তৃণমূল থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অভ্যন্তরীণ তহবিল জোগান বিশ্লেষণ করে করভিত্তি, যৌক্তিক কর হার নির্ধারণ, সীমিত কর অব্যাহতির নীতি অনুরসরণ করে উত্তম কর ব্যবস্থাপনা তৈরি করবে। অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের কাজ করবে ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, রাজস্ব আদায়ে কোনো প্রকার নেতিবাচক পরিবেশ তৈরির শঙ্কা নেই। এই প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা সম্প্রতি মতামত দিয়েছেন যে, এখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নীতি প্রণয়ন ও কর আদায় ব্যবস্থাপনা আলাদা করা হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশই এই সিস্টেমে রাজস্ব আহরণ করছে।
একই জায়গা থেকে পলিসি তৈরি হবে, আবার একই প্রতিষ্ঠান সেটা প্রয়োগ করলে নাগরিকরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ যুগের পর যুগ আমাদের দেশে এই নীতি চালু রয়েছে। যার ফলে নাগরিক সমাজ, বিশেষ করে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ীমহল থেকে এই আইন পরিবর্তন করার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই দাবিগুলোর প্রতি সম্মান রেখে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সরাসরি এনবিআরে কাজ করেছেন এমন ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে সংস্কার কমিটি গঠন করে গত বছরের অক্টোবরে। এই কমিটি গত জানুয়ারি মাসে একটি প্রাথমিক সুপারিশ দেয়। এতে এনবিআর সংস্কার করে আলাদা দুটি বিভাগ করার সুপারিশ করা হয়। তার মানে এই অধ্যাদেশ কমিটির সুপারিশের ধারাবাহিকতা। এখানে তাড়াহুড়া করে বা রাতারাতি কিছু করা হয়নি। অবশ্য অধ্যাদেশ জারির আগে বর্তমান কর্মকর্তাদের সাথে একাধিক বৈঠক হয়েছে বলেও নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। কিন্তু অধ্যাদেশ জারির পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নানা দাবি নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। কলম বিরতির ঘোষণা দেন।
প্রশ্ন হলো, এই বিরোধিতার কারণ কী? একাধিক প্রাক্তন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এর ফলে রাজস্ব খাতে প্রশাসন ক্যাডারের আধিপত্য বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। অনেকে মনে করছেন, তাদের পদ-পদবির সমস্যা হবে বা পদোন্নতিতে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। যদিও অনুমাননির্ভর দাবি নিয়ে চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে জারিকৃত অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণ বিশ্লেষণ করলে অন্তর্নিহিত কয়েকটি বিষয় সামনে চলে আসে।
১. কর্মকর্তারা (যারা আন্দোলনে) শুধু নিজেদের পদ-পদবির চিন্তা করছেন। তাদের আন্দোলনে নাগরিকদের বা দেশের কোনো স্বার্থ নেই।
২. তারা ক্ষমতার অনধিকার চর্চা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখছেন। তাই অধ্যাদেশের বিরোধিতা করছেন।
৩. দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের কর্তৃত্বের অবসানের শঙ্কা দেখছেন।
৪. তারা অনুমান করছেন যে, কর আইন প্রণয়ন ও কর আদায় একই জায়গায় থাকার ফলে তাদের মধ্যে ইউনিক দুনীর্তির যে নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল, সেটি ভেঙে পড়বে।
৫. আইনগতভাবে কোনো করদাতাকে হয়রানি করা বা অনৈতিকভাবে কোনো করদাতার কর মওকুফ করে সরকারকে রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত করার কৌশল বন্ধ হবে, ইত্যাদি।
তবে কর্মকর্তাদের যৌক্তিক দাবি কিছু থাকলে কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিধিমোতাবেক তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু নাগরিকদের সেবা থেকে বঞ্চিত করে কর্মবিরতি পালন দুটি অপরাধ। প্রথমত এটি চাকরিবিধির লঙ্ঘন। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান—যা একজন সরকারি কর্মচারী করতে পারেন না।
সরকার রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতেই পারে। সেখানে কর্মচারী হিসেবে যাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তিনি সেই দায়িত্ব পালনে বাধ্য। নিজেদের পদ-পদবি ও সুবিধার কথা চিন্তা করে পুরো জাতিকে সেবা থেকে বঞ্চিত করা বিবেক-বিবর্জিত কাজ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে আরো কঠিন হওয়া দরকার। কথায় কথায় নাগরিকদের জিম্মি করার যে সংস্কৃতি সরকারি চাকরিজীবীরা দেখাচ্ছেন, তার অবসান হওয়া জরুরি। যে কয়দিন তারা কর্মবিরতি পালন করবেন, ততদিনের বেতনভাতা ও সকল সুবিধা বন্ধ করা এবং ভবিষ্যতে যারা এই ধরনের কাজ করবেন, তাদেরকে সাময়িক চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত গ্রহণও এখন সময়ের দাবি। কেননা, একজন সরকারি কর্মচারী চাইলেই যা খুশি করতে পারেন না। নিজেদের সুবিধার জন্য নাগরিকদের জিম্মি করতে পারেন না।
আধুনিক কর ব্যবস্থাপনা ও করনীতি নাগরিকদের কল্যাণে, রাষ্ট্রের কল্যাণে আনতে হলে দরকার সমন্বিত প্রচেষ্টা। দরকার পরিবর্তনের মানসিকতা, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের আগ্রহ, সময়ের সাথে, যুগের সাথে খাপ খাইয়ে চলার মানসিকতা। নিজের স্বার্থ, দেশের স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ যখন এক হবে, ঠিক তখনই কল্যাণকর রাষ্ট্র বিনির্মাণ সম্ভব হবে। তার আগে নয়। সকলের শুভ বুদ্ধি জাগ্রত হোক।
মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন
আইনজীবী
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি আর্কাইভ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
এনবিআর বিলুপ্তির অধ্যাদেশ নিয়ে বিরোধিতার কারণ কী?
- Advertisement -





