*** আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট, বেড়েছে এলপিজি আমদানি ব্যয়
*** ১২ কেজির সিলিন্ডারে ৩০০–৫০০ টাকা বাড়তি, তবু মিলছে না গ্যাস
*** পাইপলাইনে গ্যাসের ঘাটতিতে বাড়ছে এলপিজির চাহিদা
*** সরবরাহ বাড়লেও বাজারে সংকট, মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কা
পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতির মধ্যে দেশে বোতলজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা বাড়ছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট ও জাহাজভাড়া বৃদ্ধির কারণে বেড়েছে এলপিজি আমদানির ব্যয়। এ পরিস্থিতিতে দেশের বাজারে তৈরি হয়েছে সিলিন্ডার গ্যাসের তীব্র সংকট। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিয়েও অনেক জায়গায় মিলছে না ১২ কেজির সিলিন্ডার।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দেশের বিভিন্ন এলাকায় খুচরা বাজারে এলপিজির সরবরাহে ঘাটতির খবর পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, দোকানে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার নেই। কোথাও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, আবার কোথাও টাকা দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে প্রয়োজনীয় এলপিজি সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা।
বাড়তি দামেও মিলছে না গ্যাস: বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারণ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজির বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। ১০ সেপ্টেম্বর এ দাম নির্ধারণ করা হয়। এর আগের মাসে দাম ছিল ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থা চলতি মাসে প্রতি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমালেও খুচরা বাজারে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র।
চট্টগ্রামের বাকলিয়া অ্যাক্সেস রোড এলাকার আল বারাকা স্টোরের বিক্রেতা মো. ফরিদ জানান, গত তিন দিন ধরে প্রতি সিলিন্ডারে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। ডিলারদের কাছ থেকে গ্যাস না পাওয়ায় দোকানে অনেক খালি সিলিন্ডার পড়ে আছে।
ফরিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার ১২ কেজির জেএমআই সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৮৫০ টাকায়। ফ্রেশ ও যমুনার দাম ছিল ১ হাজার ৮৩০ টাকা, টোটালের ১ হাজার ৯০০ টাকা এবং বেক্সিমকোর প্লাস্টিক সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ১০০ টাকা।
একই এলাকার চুলাঘর দোকানের বিক্রেতা রায়হান বলেন, ওমেরা ব্র্যান্ডের ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯৫০ টাকায়। টোটাল ও বিএমের দাম ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং আইগ্যাস ও ফ্রেশের দাম ১ হাজার ৮৮০ টাকা।
চান্দগাঁওয়ের খতিবের হাট এলাকার খাজা ইলেক্ট্রিকের এক বিক্রেতাও জানান, বাজারে এলপিজির সরবরাহ অনেক কম। তাঁর দোকানে বেক্সিমকোর সিলিন্ডার ২ হাজার ১০০ টাকা এবং বিএমের সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে লালখান বাজারের চাঁনমারি এলাকার বসুন্ধরা গ্যাসের ডিলার রিজেন্সি গ্যাস হাউজের মো. মহসিন জানান, এক সপ্তাহ ধরে তাঁদের কাছে কোনো গ্যাস আসছে না। বটলার থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় দোকানের কার্যক্রমও বন্ধ রাখতে হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে আমদানি ব্যয়: এলপিজির আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য নির্ধারণে সৌদি আরামকোর ঘোষিত প্রোপেন ও বিউটেনের চুক্তিমূল্য বা সৌদি সিপি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই মূল্য অনুসারে প্রতি মাসে দেশের বাজারে এলপিজির ভোক্তা পর্যায়ের দাম সমন্বয় করে বিইআরসি।
সৌদি আরামকোর ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী, আগস্টে প্রতি টন প্রোপেনের দাম ছিল ৬২০ ডলার এবং বিউটেনের দাম ৬৪০ ডলার। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে যথাক্রমে ৬২৫ ও ৬৬০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিইআরসির নিয়ম অনুযায়ী, বেসরকারি উদ্যোক্তারা এলপিজিতে ৩৫ শতাংশ প্রোপেন ও ৬৫ শতাংশ বিউটেন মিশিয়ে বাজারজাত করেন।
তবে আমদানি ব্যয়ের চাপ শুধু গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নেই। বেড়েছে জাহাজভাড়াও। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন এলপিজি পরিবহনে ভাড়া প্রায় ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। অথচ চলতি মাসের খুচরা মূল্য নির্ধারণে বিইআরসি প্রতি টনে ১৬০ ডলার জাহাজভাড়া বিবেচনায় নিয়েছে।
বিএম এনার্জির অভিভাবক প্রতিষ্ঠান স্মার্ট গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন মাইনুল আহসান খান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে এলপিজির সরবরাহ কমেছে। বড় দেশগুলো বেশি দামে গ্যাস কিনে নেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় এলপিজি সংগ্রহ করতে সমস্যায় পড়ছেন বাংলাদেশের আমদানিকারকেরা।
তিনি জানান, অক্টোবর মাসের জন্য তাঁরা কিছু এলপিজি সংগ্রহ করেছেন। তবে তা আমদানিতে বড় অঙ্কের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, মাসের শেষ দিকে অনেক প্রতিষ্ঠানের মজুতও ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের প্রতিষ্ঠানেও সোমবারের মধ্যে মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে।
পাইপলাইনের ঘাটতিতে বাড়ছে চাহিদা: দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা দৈনিক প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎস ও আমদানি মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে সরবরাহ কমে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে নিয়মিত প্রায় ৯৫০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি দামে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে পেট্রোবাংলাকে।
এদিকে ২০১৫ সালের পর থেকে নতুন গৃহস্থালি গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় বাসাবাড়ি, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় এলপিজির ব্যবহার বেড়েছে। পাইপলাইনে গ্যাস ব্যবহারকারী অনেক গ্রাহকও নিয়মিত সরবরাহ না পেয়ে বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার কিনছেন। ফলে একদিকে নতুন গ্রাহক ও অন্যদিকে আগের গ্রাহকদের বাড়তি চাহিদা সামলাতে চাপ তৈরি হয়েছে এলপিজি খাতে।
সরবরাহ বেড়েও কাটছে না সংকট: বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমানের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে বেসরকারি উৎপাদক ও আমদানিকারকেরা ১ লাখ ২৬ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ করেছেন। আগের বছরগুলোতে একই সময়ে সরবরাহের পরিমাণ ছিল ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৬ হাজার টন। অর্থাৎ পরিসংখ্যান অনুযায়ী সরবরাহ বেড়েছে। তারপরও পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বাজারে এলপিজির চাহিদা বেশি রয়েছে।
মিজানুর রহমান বলেন, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উৎপাদকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে কমিশন। তবে সরবরাহ বাড়ার পরও বাজারে সংকট থাকায় চাহিদা ও বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি ও ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, শুধু এলপিজি নয়, পুরো পেট্রোলিয়াম খাতেই সংকট চলছে। সরকার বেশি দামে এলএনজি আমদানি করে ভর্তুকি দিয়ে সরবরাহ করলেও বেসরকারি এলপিজি উদ্যোক্তাদের জন্য এমন কোনো ভর্তুকি নেই। তারপরও তাঁরা নিজেদের উদ্যোগে এলপিজি আমদানি করে বাজার সচল রাখছেন।
খুচরা বাজারে বেশি দামে বিক্রির বিষয়ে আমিরুল হক বলেন, আমদানিকারক ও প্ল্যান্ট মালিকদের পর্যায়ে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে না। তাঁদের তালিকাভুক্ত ডিলার বা পরিবেশকের বিরুদ্ধে বেশি দামে বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে ডিলারশিপ বাতিল করা হবে। তবে খুচরা বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের।
আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং পাইপলাইনে গ্যাসের ঘাটতির সম্মিলিত প্রভাবে এলপিজির বাজারে চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খুচরা পর্যায়ে সিলিন্ডারের স্বল্পতা ও বাড়তি দাম। ফলে রান্নার জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ ভোক্তারা।







