সোমবার, মে ১৮, ২০২৬

খালেদা জিয়ার ফিরে আসা কেন এত বড় খবর?

spot_img

ভিডিও

- Advertisement -

লন্ডনে চিকিৎসা শেষে চার মাস পরে যেদিন (মঙ্গলবার) দেশে ফিরলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, সেদিন সকাল থেকেই দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় টানা লাইভ বা সরাসরি সম্প্রচার করা হয় বিমানবন্দর এবং আশেপাশের সড়কের দৃশ্য। এর কয়েক দিন আগে থেকেই সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছিল খালেদা জিয়ার ফিরে আসার প্রসঙ্গটি। প্রশ্ন হলো, চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়ে ফিরে আসার মতো একটি স্বাভাবিক ঘটনা কেন এত বড় খবরে পরিণত হলো? এখানে কি কোনো অস্বাভাবাবিকতার বিষয় ছিল, নাকি তিনি খালেদা জিয়া বলেই এত বড় খবর? নাকি এখানে অন্য কোনো কারণ আছে?

রাজনীতিতে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার কথা শোনা যায় অনেক বছর ধরে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি গঠিত ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার প্রশ্নে এই শব্দযুগল অনেক বেশি সামনে আসে। এর পরবর্তী বছরগুলোতেও ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা নানা কারণেই রাজনীতির আলোচনায়, টকশোতে, লেখায় ও বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছিল।

অভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতন এবং শেখ হাসিনার দিল্লিতে আশ্রয় নেয়ার পরে যখন গত জানুয়ারি মাসে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়া লন্ডনে গেলেন, তখনও অনেকে এটিকে ‘মাইনাস টু’ বলে অভিহিত করার চেষ্টা করেছেন। অনেকের মনেই এই সংশয় ছিল যে, বেগম জিয়া কি আদৌ দেশে ফিরবেন বা ফিরতে পারবেন? যদিও তার যে শারীরিক অবস্থা বা তিনি যেসব জটিল রোগে ভুগছেন, তাতে তার পক্ষে দেশ তো বটেই, দল পরিচালনা করাও কঠিন। সেই হিসাবে তিনি রাজনীতিতে থাকলেন কি থাকলেন না, সেটি হয়তো এখন আর খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে না, কিন্তু তারপরও দলের ভেতরে খালেদা জিয়ার একটা প্রতীকী মূল্য রয়েছে। যে কারণে তিনি যখন চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গেলেন এবং প্রায় চার মাস হয়ে গেলো, তখন অনেকের মনে এই সন্দেহ দানা বেঁধেছিল যে, এবার কি তাহলে সত্যিই ‘মাইনাস টু’ হলো? যেহেতু শেখ হাসিনাও দেশে নেই।

অবশ্য গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে ‘মাইনাস টু’ বলতে দুজন ব্যক্তি (শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া) নয়, বরং অনেকে দেশের প্রধান দুটি দলকে (বিএনপি ও আওয়ামী লীগ) বুঝিয়েছেন। রাজনীতির মাঠে এখনও এই আলোচনা আছে যে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তো নয়ই, এমনকি বিএনপিকেও ক্ষমতায় আসতে দেয়া হবে না। অর্থাৎ এবারের ‘মাইনাস টু’য়ের ব্যাপ্তি আরও বড়। বস্তুত এসব কারণে চিকিৎসা শেষে খালেদা জিয়ার ফিরে আসাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না; বিএনপি সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তিনি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হবেন কি না—সেসব প্রশ্নের চেয়েও বড় কথা, খালেদা জিয়া দেশে ফিরেছেন এবং ‘মাইনাস টু’য়ের শঙ্কা আপাতত তিরোহিত হলো।

ব্যক্তি খালেদা জিয়ার ব্যাপারে বিএনপির নেতাকর্মী তো বটেই, সাধারণ মানুষেরও বিরাট অংশের আগ্রহ রয়েছে। ফলে তার কারাবরণ, অসুস্থতা, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া এবং ফিরে আসা—প্রতিটি ঘটনাই বড় খবর। রাজনীতিতে তিনি যে একটা ‘আপসহীন’ চরিত্র দাঁড় করাতে পেরেছেন, সেটি অন্য দলের নেতাকর্মীদের জন্যও অনুপ্রেরণা বলে অনেকে মনে করেন। ফলে চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেলেও বেগম জিয়ার এই ফিরে আসার তাৎপর্য অনেক।

খালেদা জিয়ার ফিরে আসার সংবাদটি বড় খবর হয়ে ওঠার আরেকটি কারণ হলো তাকে বরণ করতে বিমানবন্দরে বিপুল মানুষের উপস্থিতি। যেখানেই অনেক মানুষ, সেখানেই বড় খবরের সম্ভাবনা। তার ফিরে আসার আগের দিন যদিও দলের মহাসচিব অনুরোধ করেছিলেন যাতে নেতাকর্মী ও সমর্থকরা রাস্তায় নেমে যানজট সৃষ্টি না করেন; বরং তারা যেন রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়াকে অভিবাদন জানান—কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। কেননা উচ্ছ্বসিত নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ঠিকই রাস্তায় নেমে গেছেন। বিমানবন্দর থেকে গুলশানে খালেদা জিয়ার বাসভবন পর্যন্ত মানুষের এই যে উচ্ছ্বাস—সেটিও একটি বড় খবরের উৎস।

তারেক রহমান বা অন্য নেতারা যতই বিএনপির হাল ধরুন না কেন, খালেদা জিয়া যতদিন বেঁচে আছেন, তিনি ততদিন পর্যন্ত দলের প্রধান কাণ্ডারি—এটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা লোকের সংখ্যাই হয়তো বিএনপিতে বেশি। নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে খালেদা জিয়া দলীয় ঐক্যের প্রতীক। ফলে তার শারীরিক উপস্থিতি দলকে যতটা চাঙ্গা রাখে, তার অনুপস্থিতি ততটাই সংশয়ে রাখে। ফলে চিকিৎসা শেষে তার এই ফিরে আসাটা দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের চাঙ্গা করার একটা বড় ওষুধ বলে মনে করা হয়।

২.

খালেদা জিয়ার এই ফিরে আসাটা বড় খবর হয়েছে গণমাধ্যমের ট্রিটমেন্টের কারণে। কিছু কিছু সংবাদমাধ্যমে বিষয়টাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে মনে হয়েছে যে, তিনি দীর্ঘদিন নির্বাসনে ছিলেন এবং তারপর নিজ দেশে ফিরে এসেছেন। বিষয়টা তা নয়। তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। ছেলে ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। চার মাসের মাথায় দেশে ফিরে এসেছেন। এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু গণমাধ্যম সব আমলেই যেভাবে ক্ষমতার তোষণ করে, খালেদা জিয়ার ফিরে আসার সংবাদেও তার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। কেউ কেউ নিজেদের নানাবিধ রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক স্বার্থে অতি উৎসাহও দেখান। সেটা সব আমলেই। বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়া চিকিৎসা নিয়ে বিদেশ থেকে দেশে ফিরলে অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেল হয়তো লাইভ করতো না বা করার সাহস দেখাতো না কিংবা করা যেতো না।

চিকিৎসা শেষে খালেদা জিয়ার এই ফিরে আসা অন্তর্বর্তী সরকারের ভাবমূর্তির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা যদি তার ফিরে আসাটা বিলম্বিত হতো বা তার প্রত্যাবর্তন অনিশ্চিত হয়ে যেতো, তাহলে অনেকের মনেই মাইনাস টুয়ের ধারণাই বদ্ধমূল হতো। সেক্ষেত্রে সরকার বিএনপির পক্ষ থেকে তো বটেই, সাধারণ মানুষের তরফেও চাপের মুখে পড়তো। বিতর্কিত হতো।

আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘদিন ধরেই খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছিল। ফলে তার খালেদা জিয়ার দেশে ফেরা নিশ্চিত করতে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ থাকাও অসম্ভব নয়।

খালেদা জিয়া দেশে থাকায় বিএনপি আগামি যেকোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনায় একটি নৈতিক শক্তি হিসেবে খালেদা জিয়ার নাম ব্যবহার করতে পারবে। এতে সরকারের ওপর চাপ বাড়তে পারে, বিশেষ করে নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রশ্নে।

সর্বোপরি, চিকিৎসা শেষে খালেদা জিয়ার দেশে ফেরার অর্থ রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে ফেরা নয়। খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে কতটা ভূমিকা রাখতে দেবে, তা এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু কয়েক মাস ধরে দেশের বিশৃঙ্খল দশা এবং জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার ভেতরে এই ফিরে আসার তাৎপর্য অনেক।

আমীন আল রশীদ
সাংবাদিক ও লেখক

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি আর্কাইভ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

- Advertisement -
spot_img

আলোচিত

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

ভিডিও