বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬

জয় শাহ’র আইসিসি যখন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ক্রীড়নক

spot_img

ভিডিও

- Advertisement -

আইসিসি’র ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে ভারতীয় কর্মকর্তা শ্রী নিবাসন ও জয় শাহ (হিন্দুত্ববাদী নেতা অমিত শাহ’র পুত্র) আসার আগে পর্যন্ত নিয়ম ছিলো, যে দেশেই ক্রিকেট টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে; সেখানেই খেলতে হবে। ভারত ক্রিকেট টিমই প্রথম পাকিস্তানে কোন ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতি জানায়, নিরাপত্তাজনিত কারণে। পশ্চিমা ও অন্যান্য ক্রিকেট দল পাকিস্তানে ক্রিকেট টুর্নামেন্টে অংশ নিলেও; ভারতের ম্যানেজমেন্টের অধীনে থাকা আইসিসি টিম ভারতের পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ার আবদার পূরণ করে।

এর প্রেক্ষিতে নিরাপত্তাজনিত কারণে পাকিস্তানও ভারতে খেলতে না আসার আবেদন জানালে তা গৃহীত হয়। ভারত ও পাকিস্তানের এই পাল্টাপাল্টি আবেদন তৃতীয় কোন ভেনুতে তাদের ক্রিকেট ম্যাচ খেলার নিয়ম চালু করে। তাহলে ভারতে সমসাময়িক বাংলাদেশ বিদ্বেষী পরিবেশের কারণে বাংলাদেশ কেন নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলার সুযোগ পাবে না!

বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজ ভারতে আইপিএল খেলতে গেলে; উগ্রপন্থী হিন্দুত্ববাদীরা তার প্রতি বিদ্বেষ প্রচার করে; যে বিদ্বেষ হিন্দুত্ববাদীদের সীমাহীন মুসলিম বিদ্বেষের ধারাবাহিকতা। মুস্তাফিজকে টিমে নেয়ার জন্য টিমের মালিক শাহরুখ খানও হিন্দুত্ববাদীদের হুমকির মুখে পড়েন। অবশেষে নিরাপত্তাজনিত কারণে মুস্তাফিজকে বাংলাদেশে ফিরে যেতে হয়।

ইতোমধ্যে ভারতের আদালতে ভারতে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম নিষিদ্ধের দাবিতে রিট করা হয়েছে। এই রিট খারিজ হয়ে গেলেও হিন্দুত্ববাদীদের বাংলাদেশ মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষের প্রমাণ ঐ রিটটি।

বাংলাদেশের একজন আম্পায়ার ভারতে দায়িত্ব পালন করতে এলে; অন্ততঃ তিনটি ম্যাচে তাকে থার্ড আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। মাঠে আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করতে না পারার এই ঘটনায়; ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের বাংলাদেশী মুসলিম বিদ্বেষের কারণে সাবধানতা অবলম্বন করে তাকে থার্ড আম্পায়ার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে; এমন অনুমান যৌক্তিক বলেই প্রতীয়মান হয়।

ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশী সন্দেহে চার ভারতীয় মুসলমানকে পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট বাংলাদেশের ভারত সমর্থিত ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে এসে দিল্লি সরকারের আতিথেয়তা ও আশ্রয় গ্রহণ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নাশকতা ও হত্যাকাণ্ডের নির্দেশনা দিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধে হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হলেও দিল্লি এই অপরাধী ও তার ফ্যাসিস্ট দোসরদের ভারতের অভয়ারণ্যে অবস্থান করে; বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রে তাদের সক্রিয় থাকার ফ্যাসিলেটের হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী মিডিয়া গত ১৬ মাস ধরে বাংলাদেশের মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করে চলেছে নগ্নভাবে। ভারতের অভ্যন্তরে মুসলমানেরা যেভাবে গুজরাট থেকে কাশ্মীর হয়ে উত্তর প্রদেশ-বিহার ও দেশটির নানা অংশে এথনিক ক্লিনসিং-এর ভিক্টিম; বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের প্রতি সেরকম হুমকি ভারতের মিডিয়ায় প্রকাশ্যে রাজনৈতিক নেতা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীরা দিয়েছেন।

এরকম সাম্প্রদায়িক ক্যানিবাল রাজনীতির ক্যানভাসে ভারতে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের খেলতে যাওয়া যে অসম্ভব; তা যে কোন কমনসেন্সসম্পন্ন লোকেরই বোঝার কথা। ক্রিকেট আনন্দ ও সম্প্রীতির খেলা। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের নরভোজি পরিবেশে ক্রিকেট খেলা অসম্ভব।

ঐতিহাসিকভাবে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা বৃটিশ উপনিবেশকালে খৃস্টানদের তেলাঞ্জলি দিয়ে মুঘল শাসনের প্রতিশোধ নিতে সক্রিয় ছিলো। পরবর্তীতে ইজরায়েলের সঙ্গে যূথবদ্ধতায় মুসলমানদের এথনিক ক্লেনসিং-এর নীতিতে সমর্থন জোগাতে ভারতীয়দের ইজরায়েলি সেনাদের সঙ্গে প্যালেস্টাইনের গাযা গণহত্যায় অংশ নিতে দেখা গেছে।
এ থেকে বোঝা যায় ভারতে মুসলমান ছাড়া অন্য ধর্মের ক্রিকেটার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা দলের ক্রিকেট খেলায় ঝুঁকি নেই। কিন্তু মুসলমান ক্রিকেটারদের জন্য ভারত রীতিমতো মৃত্যু উপত্যকা। কারণ ইতিহাসের সূত্র ধরে আজকের হিন্দুত্ববাদীরা সেই অতীতের দিল্লি সালতানাত থেকে মুঘল আমলের মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চায়; দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে। ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী লোকেরা ২০১৪ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর লুকোছাপা না করেই ‘ইতিহাসের ওপর প্রতিশোধের’ এই সাম্প্রদায়িক রিরংসা অব্যাহত রেখেছে।

ভারতের সামগ্রিক মুসলিম বিদ্বেষী রাজনীতি ও সাম্প্রতিক বাংলাদেশী মুসলিম বিরোধী রাজনীতির এই অন্ধকার সময়ে ভারতে ক্রিকেট না খেলে বিকল্প ভেন্যুতে খেলতে চাওয়ার যে আবেদন; তা খুবই বাস্তবসম্মত। কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল ইন্ডিয়ান ম্যানেজমেন্টের অধীনে থাকায় বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের এই আবেদন নাকচ করে; বাংলাদেশ টিম বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ড টিমকে টি টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপে অন্তর্ভুক্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছে। এতে একদিকে বাংলাদেশকে ওয়ার্ল্ড কাপ থেকে বঞ্চিত করা যায়; অন্যদিকে ঔপনিবেশিক সময়ের ধারাবাহিকতায় সাদা সাহেবদের খুশি করে ডিএনএ-র প্রায় দু’শো বছরের সাদা সাহেব তোষণের অনুশীলনকেও ঝালিয়ে নেয়া যায়।
আইসিসি যদি এইভাবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বাস্তবায়নের টুল হয়; তাহলে তা ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কলংক হয়ে রইবে।

ভারত ও পাকিস্তান নিরাপত্তাজনিত কারণে তৃতীয় ভেন্যুতে খেলার সুযোগ পেলে বাংলাদেশ কেন সেই একই নিরাপত্তা আশংকা জনিত কারণে তৃতীয় কোন নিরাপদ ভেন্যুতে খেলার সুযোগ পাবে না! এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন।

মাসকাওয়াথ আহসান
এডিটর ইন চিফ, ই-সাউথএশিয়া

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি আর্কাইভ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

- Advertisement -
spot_img

আলোচিত

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

ভিডিও