শনিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২৬

জুলাই কারো বাপের না

spot_img

ভিডিও

- Advertisement -

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক অমিল থাকলেও ২০২৪-এর জুলাই নিয়ে আমেরিকার সাথে কী মিল হতে পারে বাংলাদেশের? চার জুলাই  আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস।  স্বাধীনতা দিবসে বাজি ফুটিয়ে, সামরিক ও পোষা পশু-পাখির কুচকাওয়াজ, তোপধ্বনি ছাড়াও সাধারণ নাগরিকেরা পার্টি দিয়ে উদযাপন করে । কেউ কেউ ফ্যাশান করে। দেয়াল, গাছ বা অনেক কিছুতে এদিন রঙ দেয়। গাড়ি ও বিভিন্ন যুদ্ধের সমরাস্ত্র প্রদর্শনী ছাড়াও ফায়ার ওয়ার্কসও সেখানে জনপ্রিয় ইভেন্ট। এই উদযাপন আড়াইশো বছরের পুরোনো। ১৭৭৬ সালে তারা গ্রেট বৃটেন থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন হয়েছিল। যদিও পরের আট বছর যুদ্ধ চলেছে। বলা হয়, প্রতিটা উদযাপন প্রতি বছর রঙ বদলায়। কোনো না কোনো নতুনত্ব আসে উদযাপনে।

উদযাপনের জন্য কেউ হেলিকপ্টার থেকে রং ছিটায়। কোনো জুটি হয়তো আকাশ থেকে চুমু খেতে খেতে প্যারাসুট পরে নিচে নেমে আসে। কেউ হয়তো জলের নিচে ডুবে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কেউ কেউ আবার আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসে ভিয়েতনামে বেড়াতে যায়। এ বছরের চার জুলাই কোন কোন পদ্ধতিতে উদযাপন করা যায়? কেউ কেউ এমন প্রস্তাবনা তুলেছেন-

১. মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প  ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলোনেস্কিকে নিয়ে একটি কমেডি ছবি বানানো যেতে পারে।

২. ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ঘুরতে যাওয়া যেতে পারে। পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে কি হয়নি, তার একটা ধারণা পাওয়া যাবে হয়তো!

৩. আফগানিস্তানে ফেলে আসা দিনগুলোর স্মরণে সেখানে যাওয়া এবং আফগানিস্তানে নিহত আমেরিকান সৈনিকদের জন্য কোনো ‘ওয়ার সিমেট্রি’ বানানো যায় কি না, তার জন্য ম্যারাথন দৌড়ের আয়োজন।

৪. ইরাকেও যেতে পারেন আমেরিকানরা। তুলনা তাদের খুব প্রিয় বিষয়। তারা ইরাকে গিয়ে দেখতে পারেন সাদ্দামের সময়ের চেয়ে এখনকার ইরাকিরা কত ভালো আছেন।

স্বাধীনতা দিবস নিয়ে বহু ছবি হয়েছে আমেরিকায়। বিখ্যাত এমন এক ছবির নাম ‘বর্ন অন দ্য ফোর্থ অব জুলাই’। অনেকেই দেখেছেন ছবিটা। টম ক্রুজের অভিনয় চোখে লেগে আছে অনেকের। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আহত এক সৈনিক যে কি না পক্ষাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। দেশে ফেরার পর তার জীবনযাপন বা যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের দারুণ এক ছবি সেটা। আমেরিকানরা যে গ্রেট এটা বোঝাতে তারা সিনেমার ওপর ভর করে বেশি। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংসে বোমাবর্ষণ এবং পরে ধ্বংস করতে না পারার সমালোচনা করে অনেক আমেরিকান বলেছেন, আমেরিকা গ্রেট শুধু সিনেমার পর্দায়, বাস্তবে ততটা নয়। যাই হোক, আমেরিকানরা এই জুলাইয়ে আরও বেশি আনন্দে মাতুক সেই কামনায় এবার নিজ দেশের দিকে নজর দিই।

জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পর কী কী হতে পারে? খুব সাদামাটাভাবে বলা যায়-

১. শহীদদের স্মরণে দোয়া মাহফিল ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের বাড়িতে যাবেন অনেকেই। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শহীদ নূর হোসেনের মতো আবু সাঈদ আইকনে পরিণত হয়েছেন। মানুষের হৃদয়ে থেকে যাবেন অনন্তকাল।

২. উপদেষ্টারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের কথামালা তুলে ধরবেন।

৩. আহতদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি করা হতে পারে।

৪. বিশাল মিছিল, র‌্যালি ও সমাবেশ হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের ছবির প্রদর্শনীও হতে পারে।

আমেরিকার সাথে উদযাপনের মিল তেমন হবে না হয়তো। এদেশে যে কোনো উদযাপনে দিনের বেলায় সিরিয়াস আলোচনা অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী বা র‌্যালি। সন্ধ্যা বা রাতে বড়জোড় গান। এখনও স্বাধীনতা বা বিজয় দিবসে গানের অনুষ্ঠার আর নাটক দেখানো হয় টেলিভিশনে। সেসব রাতে। দিনে পুনঃপ্রচার। সেই দিক দিয়ে আমেরিকানরা অনেক আমুদে বলেই মনে হয়। এদেশে ছুটি পেলে কেউ কেউ এখন ঘুরতে বের হন। যার টাকা বেশি সে বিদেশে যায়। যার টাকা কম সে বড়জোর কক্সবাজার।

জুলাই নিয়ে লেখার ঝুঁকিও আছে। মানুষ জেগেছিল, রাস্তায় নেমেছিল, চেপে বসা সরকারের পতন চেয়েছিল। রক্তের বিনিময়ে সেটা পেয়েছে মানুষ। একাত্তরেও ত্রিশ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল। মোটা দাগে তিনটা প্রশ্ন তোলা যায়:

১. বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর কি খুব বেশি সময়? আমরা কি খুব অস্থির ছিলাম তখন? জাসদ তৈরি হয়েছিল যে আকাঙ্ক্ষা থেকে, সেটা মাঠে মারা গেল কেন? পরবর্তীকালে জাসদ নেতারা বিভিন্ন সরকারের কাছে অনুগ্রহ চেয়েছেন, নেতা মন্ত্রী হয়েছেন। স্বাধীনতার ছয় সাত মাস পরেই জাসদ দল গঠন করে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রায় একই ব্যবধানে হয়েছে এনসিপি। জাসদ ছিল স্বাধীন দেশের প্রথম বাংলা নামের দল। সেখানে এনসিপি?

২. মুক্তিযুদ্ধ ও এর চেতনাকে নিজ পকেটে ঢুকাতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেও উৎখাত হয়ে গেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, বেশির ভাগই ফিরে গিয়েছিলেন যে যার পেশায়। নব্বইয়ের গণআন্দোলনে ছাত্ররাই ছিলেন সম্মুখযোদ্ধা। এরশাদের পতনের পরও যে যার কাজে ফিরেছেন। সেই হিস্যা নিতে মাঠে নেমেছেন অনেকে এমন বলা যাবে না। সেখানে জুলাইযোদ্ধাদের একাংশ কী কী করেছেন, করছেন? এনসিপি গঠন, আহতদের চিকিৎসায় গাফিলতি, কোটা বিলোপ চেয়ে নিজেদের জন্য আবার কোটা তৈরি, আহতদের হাসপাতাল দখল, একজন উপদেষ্টার অস্ত্রের ম্যাগজিন নিয়ে এয়ারপোর্টে যাওয়া ও ঘটনা প্রকাশ্যে আসা, সরকার ও উপদেষ্টাদের ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষের দুর্নীতি নিদারুণ হতাশায় ফেলেছে মানুষকে। মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিলে ক্ষতি হবে জুলাই অভ্যুত্থানেরই। এনসিপি বা সরকার কী সেটা অনুধাবন করতে পেরেছে?

৩. ড. ইউনূসের সরকার নিরপেক্ষ নয়। যেকোনো বিচারে তারা এনসিপি ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল। তারা বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলতে চায় বলেই কার্যকলাপে মনে হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের নয়, তেমনি জুলাই অভ্যুত্থানও কোনো একক দল বা কারো বাবার নয়। দেশের সংহতি ও ঐক্য বিনষ্টের কাছাকাছি, বন্দর ও করিডোর নিয়ে ভিন্নরকম আওয়াজ, নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা জুলাই বিপ্লবের ঐকতানকেই ক্ষুন্ন করেছে, করবে।

৪. দেশে মব ভায়োলেন্স চলছে। আদালত প্রাঙ্গণেই বেশি ঘটনা ঘটেছে। বেড়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা। সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে যে ব্যাখ্যাই দেয়া হোক না কেন, বিবিসি বা ভারত ছাড়া অন্যান্য দেশের মিডিয়ার ভাষ্য সুখকর নয়।

৫. দ্বিতীয় স্বাধীনতা আবার কী? একটা দেশ কয়বার স্বাধীন হয়? কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই বারবার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এসব লক্ষণ আদৌ ভালো পথ দেখাবে না। বরং এসব জুলাই অভ্যুত্থানের বিপক্ষেই যাবে। দুঃখ এই যে, সমালোচনা করলে তাকে ফ্যাসিস্টের দোসর আখ্যা দেয়া হচ্ছে। এই ট্যাগের প্রবণতা বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো তা বলার সুযোগ নেই। আওয়ামী আমলে উল্টাপাল্টা কথা বলা মন্ত্রীদের মতো উপদেষ্টারাও উল্টাপাল্টা বলছেন। আমরা কী এই জুলাই চেয়েছিলাম?

দুঃখ এই যে, এক বছরের মাথায় এমন লিখতে হচ্ছে। শহীদ আবু সাঈদ আমরা কী এমন জুলাই চেয়েছিলাম? যারা সরকারে আছেন, যারা জুলাই অভ্যুত্থানকে ক্যাশ করতে চাচ্ছেন, তাদের ক্রমাগত ব্যর্থতা আসলে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনতেই সহায়ক হবে!

আহসান কবির
সাংবাদিক ও রম্যলেখক

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি আর্কাইভ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

- Advertisement -
spot_img

আলোচিত

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

ভিডিও