গৃহবিবাদ নামে একটা সিনেমা আশির দশকে ঢাকার সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছিল। সেই সিনেমার কাহিনীকার, সংলাপ রচয়িতা এবং গীতিকার সাংস্কৃতিক সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন বাচসাস থেকে পুরস্কারও পেয়েছিলেন। অনেকদিন আগের কথা, তাই মনে নেই বাংলা সেই সিনেমা ‘হিট’ হয়েছিল কিনা?
তবে বিসিবির সাম্প্রতিক ‘গৃহবিবাদ’ নামের যে সিনেমার মঞ্চায়ন আমরা দেখলাম তা কিন্তু সুপার ডুপার হিট! এই ‘সিনেমার’ কাহিনীকার, অভিনেতা, রচয়িতা, এবং মঞ্চায়নকারি সবাই যে নিখুঁত কায়দায় অভিনয় করলেন তাতে তারা এখন ‘ক্রিকেটীয় অস্কার’ দাবি করতেই পারেন!
২১ অগাস্ট ২০২৪ সালে ফারুক আহমেদ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিসিবির বারান্দায় পা রাখতেই চারধারে একটা শ্লোগান শোনা গেল- ‘ফারুক ভাই, ফারুক ভাই।’
সেই একই জায়গায় ৩০ মে, ২০২৫ এ শোনা একই ধাঁচের শ্লোগান শুনলাম আমরা। শুধু নামটা বদলে গেল। এবার শোনা গেল- বুলবুল ভাই, বুলবুল ভাই।’ মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে বিসিবির চিত্রপট বদলে গেল। শুরু হলো নতুন শাসকের নতুন শাসক ব্যবস্থা।
বিসিবি সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর ফারুক আহমেদ আগের বোর্ডের রয়ে যাওয়া কয়েকজন পরিচালকদের নিয়েই সামনে বাড়তে চাইলেন। কিন্তু একসময় দেখলেন সেই দৌড়ে তিনি বড্ড একা। সবাই তার আশেপাশে আছেন। সঙ্গে দৌড়ানোর জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। কিন্তু সেই প্রস্তুতি যে শুধুই অভিনয়। দৌড়াতে গিয়ে ফারুক দেখলেন সঙ্গীরা কেউ দৌড়াচ্ছে না।
একটা উদাহরণ দেই। রিলে রেসে এক চক্র শেষ হওয়ার পর ব্যাটন বদলের সময় যদি সঙ্গী আপনাকে সমর্থন না দেয়, আপনার বাড়িয়ে দেওয়া ব্যাটন ধরে এগিয়ে না যায়, বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে একা আপনি সেই রেস জেতা তো দুরের কথা- শেষই করতে পারবেন না!
বিসিবিতে পুরো নয়মাসের দৌড়ে ফারুক সেই রিলে রেস তাই শেষ করতে পারলেন না। বিসিবিতে ফারুকের এই সঙ্গী পরিচালকরা যে তার অপরিচিত কেউ ছিলেন তাও কিন্তু নয়। এদের কারো সঙ্গে তিনি মাঠে ক্রিকেট খেলেছেন। ফারুক যখন নির্বাচক ছিলেন তখন এদের অনেকে আবার বিসিবির পরিচালকও ছিলেন। গত আগস্টে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ফারুক হয়ে গেলেন তাদের নেতা। তখন তাদের অনেকে নিজেদের চেয়ার এবং জান বাঁচাতে ফারুকের নেতৃত্ব মেনে ফুলের মালা নিয়ে এলেন। সেই সময়ে মনের কুটিলতা তারা লুকিয়ে রাখেন মুখে ধরে রাখা হাসির মুখোশে!
সভাপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে ফারুক আহমেদ এখন সেই অভিযোগ করছেন। বলছেন, ‘নোংরা এক ষড়যন্ত্রের শিকার আমি। তারা শুরু থেকেই কুটিল মন মেজাজ নিয়ে আমাকে সরানোর অপেক্ষায় ছিল। নয়মাস যারা চক্রান্ত করেছে তারা চুড়ান্ত একটা ফলাফল পেয়েছে। নয়মাস বলছি আমি, কিন্তু আমার মনে হয় যেদিন আমি দায়িত্ব নিয়েছি তার সাতদিনের মধ্যে থেকেই এই চক্রান্তের শুরু হয়েছে। সেই হিসেব করলে আমি নয়মাস এই চক্রান্তকারিদের সঙ্গে কাটিয়ে দিলাম। সময়টা বেশ লম্বাই। আমি আসলে যে ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছি সেই মুহূর্তে বুঝতে পারিনি। তারা চক্রান্ত করেছে অনেক আগে থেকে। বোর্ডে যে পরিচালকরা ছিলেন তারাই আমার সঙ্গী হলেন। আমি কিন্তু নতুন কোনো পরিচালককে পাইনি। যাকে নতুন (নাজমুল আবেদিন ফাহিম) পেয়েছিলাম, ওনাকে খুব তাড়াতাড়ি আমার পাশ থেকে হারিয়েছি। একটা দলের মধ্যে নয়জন বনাম একজন হয়ে গিয়েছিল।’
ফারুকের এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার একসময়ের ব্যবসায়িক পার্টনার এবং বর্তমানে বিসিবির পরিচালক ইফতেখার আহমেদ মিঠু উল্টো অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, ফারুক আহমেদের নেতৃত্বে তো আমরা কাজ করার সুযোগই পাইনি। বিসিবির সাব-কমিটি গঠন করতেই তিনি পাঁচমাসের বেশি সময় লাাগিয়ে দিলেন। তিনি এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নিতেন। তিনি আসলে বিসিবিতে কাজ করার মতো কোনো টিম গড়তেই পারেননি।
ফারুকের ব্লেইম এবং ইফতেখারদের সম্মিলিত উল্টো ব্লেইম গেমে একটা বিষয় পরিস্কার, বিসিবি পরিচালনার ‘দল’টা ভুল ছিল। যে ‘একাদশ’ নিয়ে এই খেলায় নামার প্রয়োজন ছিল ‘অধিনায়ক’ ফারুকের, সেটা ছিল ভুল কম্বিনেশনে ভরা- ‘ভুল একাদশ’। আর ভুল একাদশ কখনোই আপনাকে ম্যাচ জেতায় না।
ফারুক হেরে গেছেন সেখানেই। সেই শুরুতেই! অধিনায়ক জেতার জন্য মরিয়া আর তার দলের বাকি ‘খেলোয়াড়রা’ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কখন দল হারবে! অধিনায়কের বিদায় হবে। বোর্ড সভায় সই স্বাক্ষর দিয়ে সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত হওয়ার পর যখন পরিচালকরা বলেন এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আমি কিছু জানতাম না-তখন বুঝতে হবে সেই পরিচালক হয় হদ্দ বোকা, অযোগ্য নয়তো ভীষণ চালাক ও কুটিল।
পাপন-মল্লিকের প্রিয়ভাজন পরিচালকরা বিসিবিতে রয়ে গেলেন ঝান্ডা গেড়ে আর ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব পাওয়া ফারুক আহমেদ অপসারিত হলেন তার নিয়োগ কর্তার সায়-এ।
ক্রিকেট অধিনায়ক হিসেবে অনেক ম্যাচ জিতেছেন ফারুক। আবার হেরেছেনও। তবে বিসিবি সভাপতির চেয়ার থেকে যে কায়দায় এবং কুটিলতার সঙ্গে তাকে হটানো হলো আপনি সেই আউটের নতুন একটা নাম দিতেই পারেন- বেঈমানি ও টাকার কাছে আউট!
পেছনের এই নয় মাসে বাংলাদেশ ক্রিকেট অনেক উন্নতি দেখেছে। অবনতিও দেখেছে সেই একই সঙ্গে। এই সময়ে আমরা প্রথমবারের মতো পাকিস্তানকে পাকিস্তানের মাটিতে টেস্ট সিরিজে হারিয়েছি। আবার ভয়াবহ ভরাডুবিও দেখেছি। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কোনো ম্যাচে ন্যূনতম লড়াই করতে পারিনি। জিম্বাবুয়ের কাছে দেশে টেস্টে হার দেখেছে বাংলাদেশ। আরব আমিরাতের কাছে টি- টোয়েন্টি সিরিজ হেরেছে, যা ছিল পুরো অপ্রত্যাশিত। পাকিস্তানের কাছে এই ফরমেটে হোয়াইটওয়াশড হয়েছে দল। আর্থিক সাফল্য পেলেও বিপিএল শেষ হয়েছে বিপুল বদনাম নিয়ে। তিন ফরমেটেই এই সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট র্যাঙ্কিংয়ে আরো পিছিয়েছে। ধাক্কা খেয়েছে পুরো ক্রিকেট কাঠামো। মাঠে দল খারাপ করছে আর বোর্ড পরিচালকরা দৌড়াদৌড়ি করছেন বিসিবির পরের নির্বাচনে ভোট বাগাতে! ফারুকের সঙ্গে বাকি পরিচালকদের দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণও হয়ে উঠেছিল বিসিবির এই ভোট, ক্লাব ও কাউন্সিলর বানিজ্য। এই বিসিবিকে অনেকে নিজের বাপ-দাদার জায়গীরদার বানিয়ে ফেলেছেন। বছরের পর বছর তারা এখানে শাসক হিসেবে আবির্ভুত হয়েছেন। ক্রিকেটকে উচ্চারণ করছেন কি..র..কেট বলে, এমন লোকও বিসিবির গদিতে নিজেকে দেখতে চান হরদম।
কারণ বিসিবি মানেই কোটি কোটি টাকার ঝংকার! মুফতে বিদেশ সফর। মানিব্যাগে টাকার জায়গায় ডলার! পরিছন্ন ক্রিকেটে বিশ্রী বিসিবির কদর্য রূপের দেখা মিলল পেছনের নয়মাসের সিনোমাটিক এমনসব ঘটনায়!
এম. এম. কায়সার
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি আর্কাইভ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
ডার্টি গেম, ব্লেইম গেম এবং বিশ্রী বিসিবি!
- Advertisement -





