উত্তরা থেকে প্রতিদিন মতিঝিলে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন তামনিয়া ইসলাম। নিয়মিত মেট্রোরেলে যাতায়াত করলেও গত বৃহস্পতিবার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে ওঠার পর রাতেই মা-মেয়ে দুজনের জ্বর শুরু হয়। তামনিয়া ইসলামের জ্বর দুই দিন পর অনেকটাই কমে গেলেও ১০ বছর বয়সি মেয়ে এখনো জ্বরে আক্রান্ত। এরই মধ্যে রোববার থেকে জ্বরে ভুগতে শুরু করেছে তার চার বছরের ছোট মেয়েও।
তামনিয়া ইসলাম বলেন, ‘দুই বাচ্চাই জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় খুব দুশ্চিন্তায় আছি। বুঝতে পারছি না, ওরা ডেঙ্গু বা হামে আক্রান্ত হলো কি না।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের মার্চ-এপ্রিল এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশে ভাইরাসজনিত রোগের প্রকোপ তুলনামূলক বেড়ে যায়। বর্তমানে হাম, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফয়েড, মামসসহ বিভিন্ন ভাইরাস ও সংক্রমণজনিত রোগ একসঙ্গে ছড়াচ্ছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু ও ইনফ্লুয়েঞ্জার রোগী বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-এ ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী ঢাকায় গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমপূর্ণ স্থানে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবারে পরিবারে। একজন আক্রান্ত হওয়ার পর একই পরিবারের অন্য সদস্যরাও জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন।
শিশু হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে: রোববার সকালে রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই শিশু রোগীদের ভিড়। কোথাও অভিভাবকদের জটলা, আবার কোথাও সন্তানকে কোলে নিয়ে চিকিৎসকের সিরিয়ালের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন মা-বাবারা।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ শিশুকে হাসপাতালে আনা হয়েছে জ্বরের কারণে। কারো নাক দিয়ে পানি পড়ছে, কারো কাশি কিংবা শ্বাসকষ্ট রয়েছে। জ্বরে দুর্বল হয়ে অনেক শিশু অভিভাবকের কাঁধে মাথা রেখে আছে। সকাল থেকেই হাসপাতালের পাঁচটি কাউন্টারে চিকিৎসকরা রোগী দেখছিলেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ সময়ে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত মেডিসিন বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ রোগী আসত। বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬ থেকে ৮ শতাংশ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে। অন্যদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে।
জ্বরের পেছনে নানা রোগ: জ্বর নিয়ে হাসপাতালে আসা শিশুদের মধ্যে নানা ধরনের রোগ শনাক্ত হচ্ছে। পাঁচ বছর বয়সি সাধিয়ার দুই দিন ধরে জ্বর। মুখ ও গলা ফুলে যাওয়ায় প্রথমে তার পরিবারের সদস্যরা টনসিলের সমস্যা ভেবেছিলেন। পরে চিকিৎসক দেখানোর পর শিশুটির মামস হওয়ার আশঙ্কার কথা জানানো হয়। পরীক্ষা করা হয়েছে, রিপোর্ট পাওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছেন শিশুটির বাবা।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, বর্তমানে ইনফ্লুয়েঞ্জা, সাধারণ সর্দি-জ্বর, টাইফয়েড ও প্যারা-টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগী আসছেন। তবে জ্বরের রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাই বেশি।
তিনি বলেন, অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগীর বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। তবে শিশু, বয়স্ক ও বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ, লিভার ও কিডনির রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং গর্ভবতী নারীদের ডেঙ্গু হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এ ছাড়া ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী খাবার খেতে না পারলে, অতিরিক্ত বমি হলে বা রক্তক্ষরণের মতো লক্ষণ দেখা দিলে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি বলে জানান তিনি।
হাম ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশু বেশি: বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, বর্তমানে মৌসুমি জ্বর ও ফ্লুর পাশাপাশি হাম, ডেঙ্গু ও টাইফয়েডে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেশি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি শিশু আক্রান্ত হচ্ছে হাম ও ডেঙ্গুতে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে টাইফয়েড। হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পরও কিছু শিশু বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে আবার হাসপাতালে আসছে।
এ ছাড়া মামস, ভাইরাল হেপাটাইটিস এ, ফ্লু, টনসিলাইটিস, ফ্যারেঞ্জাইটিস, কনজাংটিভাইটিস ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েও শিশুরা জ্বরে ভুগছে। চিকুনগুনিয়া আক্রান্তদের অনেকের ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে তীব্র জয়েন্টের ব্যথার অভিযোগ রয়েছে।
ডা. কামরুজ্জামান বলেন, জ্বরের সঙ্গে শিশুর শরীরে র্যাশ দেখা দিলে তাকে বাড়িতে না রেখে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখার পরামর্শও দেন তিনি।
জ্বর হলে শিশুকে পর্যাপ্ত তরল খাবার দিতে হবে এবং বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। জ্বরের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে নিজের সিদ্ধান্তে অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
১৩ দিনেই ডেঙ্গুতে ৫২ মৃত্যু
চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৩ দিনেই ডেঙ্গুতে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪৯ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের রোববার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫১৬ জন নতুন রোগী।
এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৮৩৭ জনে। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪৮ হাজার ৯৩ জন।
মৃতদের মধ্যে ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ নারী এবং ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামের উপসর্গেও বাড়ছে মৃত্যু: হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৯০৫। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৪৩ জনে।
একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২০ হাজার ৬৯ জনের শরীরে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৩ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে।
১৫ মার্চ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৯২২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামে মৃত্যু হয়েছে আরও ১০০ শিশুর।
একসঙ্গে বিভিন্ন ভাইরাস ও সংক্রমণজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ায় জ্বরকে সাধারণ সমস্যা হিসেবে অবহেলা না করে লক্ষণ বুঝে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।





