সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল ২০১৯ সালে যখন তার আত্মজীবনী ‘জীবন পাতার জলছাপ’ বইটি প্রকাশ করেন, তখনও তিনি সিইসি হননি। ওই বইয়ের ২৬৩ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, ‘ক্ষমতাধর মানুষদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যই হলো তারা সমালোচনা শোনার চেয়ে প্রশংসা বা স্তুতি বাক্য শুনতে অধিক পছন্দ করেন। নেতাদের মধ্যে তো এই বৈশিষ্ট্য প্রবলভাবে বিরাজ করে।…অনেক বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, গণতন্ত্রের চর্চায় সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করা যতটা না জরুরি, তার চেয়ে বেশি জরুরি তার মন্দ কাজের সমালোচনা করা।’
এর তিন বছর পরে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হন কাজী হাবিবুল আউয়াল—যার নেতৃত্বধীন কমিশনের অধীনে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন—যে নির্বাচনটিকে ‘আমি ও ডামির নির্বাচন’ বলে অভিহিত করা হয়। নির্বাচনটি দেশে-বিদেশে দারুণ সমালোচনার জন্ম দেয়।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের ঠিক এক মাসের মাথায় হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন পদত্যাগের ঘোষণা দেয়। ৫ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনিসহ তার কমিশনের সদস্যরা পদত্যাগ করার মনস্থির করেছেন। রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়ার জন্য পদত্যাগপত্রগুলো ইসি সচিবের কাছে তারা জমা দিয়েছেন। এ সময় নিজের বক্তব্যে তিনি ১৯৭৩ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত সব কটি নির্বাচনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
কিন্তু পদত্যাগ করেও শেষরক্ষা হয়নি। তিনি এখন কারাগারে। বিতর্কিত নির্বাচন করার অভিযোগে বিএনপির দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন আরেক সাবেক সিইসি কে এম নুরুল হুদা। অবশ্য গ্রেপ্তারের আগে তাকে জুতাপেটা করা হয়, গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এরকম ঘটনা এটিই প্রথম।
কয়েকটি প্রশ্নের সুরাহা করা দরকার।
১. নির্বাচন কেমন হবে, সেটি কি শুধু সিইসির ওপর নির্ভর করে?
২. নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন, কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ইসি কিছু করতে পারে? যদি না পারে তাহলে বিতর্কিত নির্বাচনের জন্য শুধু একজন সিইসিকে গ্রেপ্তার করা বা তাকে শাস্তি দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত?
৩. বিগত তিনটি, অর্থাৎ ২০১৪, ২০১৮ এবং সবশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালনকারী তিন সিইসিসহ আরও অনেকের বিরুদ্ধে বিএনপির পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন বিতর্কিত করার অভিযোগ প্রমাণ হবে কী করে?
৪. সিইসি ও নির্বাচন কমিশনাররা ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করেন। এই পদে আসীন হওয়ার আগে তারা বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তারাও কি তখন প্রশ্নের চেয়ে প্রশংসা শুনতেই বেশি সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না? কাজী হাবিবুল আউয়াল নিজে প্রশংসা বা স্তুতি শোনার কালচার পরিবর্তনে কতটুকু ভূমিকা রেখেছেন?
৫. সাবেক দুই সিইসিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আছেন কাজী রকিবুদ্দিন আহমদ—যার নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধীনে হয়েছিল ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন। তিনিও কি গ্রেপ্তার হবেন বা তিনি কি দেশে আছেন?
৬. বিএনপি বিগত তিনটি নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত সিইসিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অথচ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা যে মাত্র ৩০টি আসনে জয়ী হয়েছিল এবং আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন পেয়েছিল, সেই নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপির কোনো আপত্তি নেই কেন? তারা কি মনে করে ২০০৮ সালের নির্বাচনটি অবাধ-সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে? বাংলাদেশে অবাধ-সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে সেখানে বিএনপি মাত্র ৩০টি আসন পাবে—এটা বিশ্বাসযোগ্য? যদি না হয় তাহলে ২০০৮ সালের নির্বাচন পরিচালনাকারী কমিশনের বিরুদ্ধে বিএনপির অভিযোগ নেই কেন? ওই কমিশনের একজন সদস্য বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা বলে, নাকি ওই নির্বাচনটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়েছিল বলে? ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুললে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে বলে বিএনপি সচেতনভাবে নবম সংসদ নির্বাচনের বিষয়টি এড়িয়ে গেলো?
আসা যাক ভালো নির্বাচনের প্রশ্নে।
২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগন্নাথদীঘি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চলাকালে একটি ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে তর্কে জড়ান চিরঞ্জীব বড়ূয়া নামে পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শক। কেন্দ্র না ছাড়লে তিনি সাংবাদিকদের আটক করার হুমকি দেন। সাংবাদিকরা তাকে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মেনে দায়িত্ব পালন এবং সংযত আচরণের পরামর্শ দিলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘আমি এসপি সাহেবের ডিউটি করছি। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মানার সময় নেই।’ (প্রথম আলো, ২৬ ডিসেম্বর ২০২১)।
এরপর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর ডিসি-এসপিদের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচন কমিশন। বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে সৃষ্ট আস্থাহীনতার জন্য ডিসি-এসপিদের দায়ী করলে তিনি সম্মিলিত প্রতিবাদের মুখে পড়েন। একপর্যায়ে কমিশনার আনিছ বলেন, তাহলে কি আপনারা আমার বক্তব্য শুনতে চান না? তখন সবাই একযোগে ‘না’ বলে উঠলে নিজের বক্তব্য শেষ না করেই তিনি বসে পড়েন।
সংবিধান বলছে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। অথচ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা এই কমিশনের কথা শুনবেন না বলে সম্মিলিতভাবে জানিয়ে দিলেন। সুতরাং, এই নির্বাচন কমিশনের পক্ষে কী করে একটি অবাধ-সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব? এইধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, মাঠ প্রশাসনের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো কর্তৃত্ব নেই বা তারা যদি নির্বাচন কমিশনের কথা না শোনেন তাতেও তাদের কোনো অসুবিধা হবে না। এটি একজন জেলা প্রশাসক যেমন জানেন, তেমনি পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শকও জানেন!
বাস্তবতা হলো, নির্বাচন কমিশন যতই নিরপেক্ষ থাকুক; নির্বাচন কেমন হবে সেটা পুরোপুরি নির্ভর করে ডিসি-এসপিদের ওপরেই। বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষে শতভাগ নিরপেক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব কি না—সেটি অনেক পুরোনো তর্ক। কেননা নির্বাচন কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যতই দলনিরপেক্ষ, সৎ, সাহসী ও যোগ্য হোন না কেন; মাঠ প্রশাসন যদি না চায়, তাহলে ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। ভোট কেমন হবে, সেটি নির্ভর করে যে সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে; তারা কেমন ভোট চায়, তারওপর। মাঠ প্রশাসন যেহেতু সরকার তথা নির্বাহী বিভাগের অধীন এবং নির্বাচন কমিশনের কথা না শুনলে যেহেতু তাদের কোনো শাস্তির ভয় নেই কিংবা শাস্তি হলেও নির্বাহী বিভাগ থেকে তার ‘সুরক্ষা’ ব্যবস্থার যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে; মাঠ প্রশাসন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশের বাইরে যাবে না। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন কী নির্দেশনা দিল, তার চেয়ে বড় কথা- সরকার বা নির্বাহী বিভাগ তাকে কী বলছে?
নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নেই। ভোট পরিচালনায় যে বিপুল সংখ্যক জনবল দরকার, সে পরিমাণ লোক তার নেই। ফলে তাকে পুরো নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্ভর করতে হয় নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের ওপর। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ বলছে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন ভোট পরিচালনার জন্য সরকারের কাছে যে সহায়তা চাইবে, সরকার সেটি দিতে বাধ্য। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে যারা থাকেন তারা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কর্মী নন। বরং তারা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োজিত এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্তা ব্যক্তিরা যা বলবেন, যে নির্দেশনা দেবেন, তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং তারা কতটা নিরপেক্ষভাবে ভয়-ভীতি ও লোভের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন, তারওপর নির্ভর নির্বাচনটি কেমন হবে। অর্থাৎ মাঠ প্রশাসন যদি ইসিকে সহায়তা না করে; তারা যদি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর মতো আচরণ করে; মাঠ প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ না থাকে বা থাকতে না পারে— তাহলে খুব ভালো নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
ধরা যাক, সিইসি ও কমিশনার হিসেবে দেশের সবচেয়ে মেধাবী, যোগ্য, সৎ ও সাহসী মানুষেরাই নিয়োগ পেলেন। কিন্তু একটি নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করে না। পুরো সিস্টেম যদি ভালো নির্বাচনের সহায়ক না হয়, তাহলে একজন সিইসি এবং চারজন কমিশনারের পক্ষে কিছুই করার নেই। তাদের নিয়ত যদি সহিহ হোক না কেন, পুরো সিস্টেম যদি তাদেরকে সহযোগিতা না করে তাহলে তাদের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
যদি সরকার তথা নির্বাহী বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে পুরোপুরি সহযোগিতা না দেয়; যদি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধি মেনে দায়িত্বশীল আচরণ না করেন, তাহলে শুধুমাত্র পুলিশিং বা বিচার করে নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক রাখা সম্ভব নয়।
বিগত তিনটি নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত খারাপ নির্বাচন হয়েছে, এ বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম। কিন্তু এই খারাপ নির্বাচনের দায় শুধু ওই তিন সিইসির নয়। এটা পুরো নির্বাচনি ব্যবস্থার ত্রুটি। সরকার, বিশেষ করে সরকারপ্রধান যদি না চান, তাহলে পুরো নির্বাচন কমিশন ঐক্যবদ্ধ থেকেও ভালো নির্বাচন করতে পারবে না। তাহলে কমিশনের কী করণীয়? তারা এরকম পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করতে পারতেন। কিন্তু আমাদের দেশে পদত্যাগের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।
নুরুল হুদা কমিশনের সদস্য মাহবুব তালুকদার বরাবরই স্রোতের বিপরীতে হেঁটেছেন। তিনি বারবার নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন; অনিয়ম অব্যবস্থাপনা নিয়ে বারবার কথা বলেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু শেষদিন পর্যন্ত পদেও বহাল ছিলেন। প্রতিবাদ করে তিনি পদত্যাগ করতে পারতেন। কিন্তু তা করেননি। বরং বারবার তিনি নিজেকে স্রোতের বিপরীতের মানুষ প্রমাণ করতে চেয়েছেন। আদতে নির্বাচনকে এবং ইসিকে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। উপরন্তু শেষ মুহূর্তেও সিইসির সঙ্গে তার বাহাস ও মতদ্বৈততা প্রকাশ্য হয়েছে—যাতে করে এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি মানুষের কাছে রসিকতার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ট্রল হয়েছে—যা একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জন্য মোটেও সম্মানের নয়। সুতরাং, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং ক্ষমতাকাঠামোর পরিবর্তন না করে বিতর্কিত নির্বাচনের দায়ে সাবেক সিইসিদের নাজেহাল ও গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে আখেরে দেশের শাসনব্যবস্থায় কতটুকু ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, সে প্রশ্ন তোলাই থাকলো।
আমীন আল রশীদ:
সাংবাদিক ও লেখক
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি আর্কাইভ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






