বিএনপি ও জামায়াতের যারা নতুন রাজনীতিতে এসেছেন; তারা আওয়ামী লীগের পনেরো বছরের শাসনকালে তাদের দেখে যে রাজনীতি শিখেছেন; তা আনলার্ন করতে হবে।
আপনাদের বুঝতে শিখতে হবে রাজনীতি মানে জনসেবা। সেবকের দায়িত্ব সেবা করা। এই যে আওয়ামী লীগকে দেখে শিখেছেন, জনগণ কিছুই জানে না, কিছুই বোঝে না; তাদেরকে শেখানোর দায়িত্ব রাজনৈতিক দলের; এটা সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা।
পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে রাজনীতি সচেতন মানুষ আর কোথাও নেই। রাজনীতি সম্পর্কে জানে ও বোঝে বলেই এদেশের জনগণ বৃটিশ, পাকিস্তান ও ভারতের ঔপনিবেশিক দাদাগিরি অস্বীকার করেছে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে যখন যে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন; ঠিক সেটাই নিয়েছে।
বাংলাদেশের স্বশিক্ষিত জনমানুষ উদয়াস্ত পরিশ্রম করে; তারপর চা’খানায় একসঙ্গে হয়; তারপর সেখানে যে রাজনীতির আলোচনা হয়; তা টিভি টকশো ও পত্রিকার উপসম্পাদকীয়’র চেয়ে অনেক কার্যকর, দল নিরপেক্ষ, দেশের জন্য কল্যাণকর।
কাজেই যারা ফেসবুকে, টিভি টকশোতে ও পত্রিকায় জনগণকে সচেতন করতে আসে; তাদেরকে বুঝতে হবে দেশের স্বশিক্ষিত সাধারণ মানুষ সার্বক্ষণিক রাজনীতি করে; আর আপনারা দল করেন। সাধারণ মানুষের চিন্তা সামষ্টিক, সমাজের সবাইকে নিয়ে; আর আপনার চিন্তা কেবল আপনার দল নিয়ে।
এর কারণ হচ্ছে, যে মানুষটি কায়িক পরিশ্রম করেন, যে একটি কাজ জানে; সে সারাজীবন কাজ করে জীবন নির্বাহ করে; আর যে মানুষটি অপেক্ষাকৃত অলস, যে কোন কাজ জানে না; তাকে দল করে খেতে হয়। পুরোনো বন্দোবস্তে আমরা যে দলীয় রাজনীতি দেখেছি; তা ছদ্ম বেকারত্ব। একটা লোক কোন কাজ পারে না; তাই সে দল পাকিয়ে গ্যাং বানিয়ে চাঁদাবাজি, জলমহাল-বালুমহাল দখল, হাট বাজারের ইজারা দখল করে, টেণ্ডার বানিজ্য করে, প্রকল্পের কমিশন খেয়ে, তদবির বানিজ্য করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়। অত্যন্ত অসত অনৈতিক আর অশ্লীল এই বেঁচে থাকা। পুরোনো বন্দোবস্তে বাড়ির বখে যাওয়া ছেলেটিই দলীয় ক্যাডার হয়ে ভাগ্য ফেরায়। ক্লাসের সবচেয়ে খারাপ ছাত্রটি রাজনৈতিক মাস্তান হয়।
আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে ক্লাসের মাঝারি ছাত্রটি গ্রন্থকীট হয়ে বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরিতে যায়। চাকরিতে ঢুকে সে আনুষ্ঠানিক চাঁদাবাজি করে; আমরা যাকে ঘুষ বলি। এরপর সে পরিণত বয়সের দলবাজিতে লেগে পড়ে। ফলে ডিসি এসপি ওসিকে আমরা যুবলীগের নেতার মতো বক্তৃতা দিতে দেখেছি। এই কাজে সুবিধার জন্য পিএসসিকে প্রভাবিত করে সরাসরি ছাত্রলীগ করা ছেলে মেয়েদের সরকারি চাকরিতে ঢুকিয়ে দেবার প্রবণতা আমরা দেখেছি।
আমাদের আরো দুর্ভাগ্য হচ্ছে, ক্লাসের ভালো ছাত্রটি বুদ্ধিজীবী হয়ে আবার সেই দলীয় ভাঁড়ে পরিণত হতে দেখেছি আমরা। কঠিন কঠিন ভাষায় বিবৃতি দিলেও, টকশোতে চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বললেও; কাজটা সে দলীয় ক্যাডারেরই করে। এদের জীবনের লক্ষ্য প্লট, পদবী, পদক, সরকারি প্রকল্পে উপদেষ্টা হওয়া, বিভিন্ন কমিটিতে ঢুকে “কাম মিট এন্ড টি” করে সম্মানীর খাম নিয়ে আসা।
এই যে দলীয় লোকেদের উঞ্ছজীবনের যে পরিচয় আমরা পেয়েছি; নৈতিকভাবে দেউলিয়া এসব লোক এসে কোন সাহসে দেশের সাধারণ মানুষকে রাজনীতি, সংবিধান, গণতন্ত্র, সুশাসনের জ্ঞান দেন। কাজ করে খেতে ও সৎ জীবন যাপন করতে ইচ্ছা করেনা; তাই লেটুর দলের নটনটী হয়ে নাচানাচি করে সচ্ছলতা লাভের গৃধনু জীবন; এমন অকিঞ্চিতকর জীবন কি মানুষের হয়!
আওয়ামী লীগের লোকের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুলিশি, মদিনা সনদের পুলিশি, সাম্প্রদায়িক বেঙ্গল রেনেসাঁকেন্দ্রিক প্রগতিশীলতা শিক্ষা দেবার যে একঘেয়ে প্রবণতা; তাতে রীতিমত বিরক্ত হয়ে পড়েছে এদেশের তরুণ প্রজন্ম। অর্ধশিক্ষিত চোর ডাকাতের মুখে এতো ভ্যাজর ভ্যাজর শুনতে চায়নি তারা। তাই “নাটক কম কর পিও” বলে খেদিয়ে দিয়েছে তাদের।
বিএনপি ও জামায়াতকে মনে রাখতে হবে; আওয়ামী লীগের ঐ ভিলেজ পলিটিক্সের আঙ্গিকে দেশের মানুষকে জ্ঞান দিতে এলেই তা ব্যাক ফায়ার করবে। যেসব জ্ঞান বহু ব্যবহারে জীর্ণ দেশডাকাতির কলাকৌশল হিসেবে ভীষণ অপছন্দের; ওসব কথা বলতে এলেই তরুণ প্রজন্ম ফেসবুকে হাহা ইমো দিয়ে দেয়।
৫৪ বছরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের রাজনীতির যাত্রাপালার পাণ্ডুলিপি, বি গ্রেড ফিল্মের চিত্রনাট্য এতোই মাঠা যে ঐ বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখার পক্ষে কেউ হা করলেই বোঝা যায়; এরপর সে কি বলবে! এতো প্রেডিক্টেবল এইসব শাসক শোষক পরিতোষক স্থূল সৌন্দর্য ধারক যে; তাদের কেউ কেউ কথাকে ভারি করে তুলতে ডুর্খহেইম, ওয়েবার, টার্নার এসব ইনডেক্স মুখস্থ করা স্টান্ট, কিংবা সালসা, মাসালা, রিসালা টাইপের মুখস্থবিদ্যার স্টান্ট দিতে শুনলেই বোঝা যায়, লোকটা বিএনপি অথবা জামায়াতের শীর্ষ নেতার চোখে পড়তে চায়। দলীয় বুদ্ধিজীবী হিসেবে আওয়ামী লীগের ভাঁড়েরা যে সুদক্ষ অভিনয় করে ধরা খেয়ে এখন মুখ লুকিয়ে বসে আছে; তাতে কোন সাহসে নব যুগের নব ভাঁড়েরা তাদের কাঁচা অভিনয়ে নব পারিষদ হতে মরিয়া; তা সত্যিই মাথায় আসে না।
বিএনপি ও জামায়াতের উচিত নতুন সময়ের দেয়াল লিখন, গ্রাফিতি, মিম পড়তে ও বুঝতে শেখা। আমরা কখনোই চাইনা তারা আওয়ামী লীগের মতো বোকা হয়ে ঘুরুক। থিংস হ্যাভ চেঞ্জড। নতুন প্রজন্মের মনোজগত এতো আলাদা যে বিংশ শতকের বিদ্যা দিয়ে, অভিজ্ঞতা দিয়ে, ক্লিশে দিয়ে রাষ্ট্রপরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আপনি কি বলতে পারেন, কতটুকু জানেন, কতটুকু বোধ বুদ্ধি আপনার; তা আমাদের অকল্যাণরাষ্ট্রের শোকগাথার পাতায় পাতায়; আজন্ম দরিদ্র মানুষের মুখমণ্ডলে লেখা আছে। ধুলিধূসর কবরস্থানে শায়িত হতভাগ্য নাগরিকের কংকালে পুরোনো বন্দোবস্তের নির্যাতনের চিহ্ন আঁকা আছে।
সুতরাং শুনুন, শোনা প্রাকটিস করুন।






