‘চোখ ও হাত বেঁধে সীমান্তে এনে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে (পুশ-ইন) ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। দেশের তিনটি সীমান্তপথ দিয়ে শুক্রবারও অর্ধশত লোককে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হয়েছে।’
বিডি আর্কাইভে এরকম একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে—যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ভারত আমাদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণে অভ্যস্ত এবং সীমান্ত সুরক্ষায় আমাদের সরকারগুলো কতটা সচেতন!
সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তে পুশ-ইন চলছে। অর্থাৎ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী শত শত লোককে বাংলাদেশ ঠেলে দিচ্ছে, যাদের বিরাট অংশই রোহিঙ্গা। শুধু তাই নয়, তারা জাতিসংঘের নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদেরকেও বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে—যা স্পষ্টত মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
এই সময়কালে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারত কত শত লোককে পুশ-ইন করেছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও সংখ্যাটি যে হাজারের কম নয়, তা বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত যেহেতু পুরোপুরি সুরক্ষিত নয় এবং রাতের আঁধারেই মূলত পুশ-ইন হয়ে থাকে, ফলে হিসাবের বাইরেও বিএসএফ কত লোককে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দিয়েছে, তা নিশ্চিত নয়।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সরকারে আছেন একজন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, একজন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, একজন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা, একজন আন্তর্জাতিক বিষয় সংক্রান্ত বিশেষ দূত এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিশেষ সহকারী। উপরন্তু প্রধান উপদেষ্টা নিজেই একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষ। এরকম একটি ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সরকার’ ক্ষমতায় থাকার পরেও প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষীরা কী করে প্রতিনিয়ত পুশ-ইন করে যাচ্ছে, সেটি বিরাট প্রশ্ন।
বাংলাদেশ সরকারের তরফে এই ইস্যুতে যে ভাষায় ও ভঙ্গিতে প্রতিবাদ করার প্রয়োজন ছিল, সেটি চোখে পড়ছে না। যে ধরনের পদক্ষেপ প্রত্যাশিত, সেটিও অনুপস্থিত। ভারতে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদেরকে যে বিএসএসফ বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে, এই বিষয়টি কি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘকে বাংলাদেশের তরফে জানানো হয়েছে? প্রতিবাদ করা হয়েছে? প্রতিকার চাওয়া হয়েছে?
পুশ-ইন ঠেকাতে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কি সঠিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করছে বা করতে পারছে? তাদের সক্ষমতায় কোনো ঘাটতি থাকলেও সেটি পূরণে কি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
ভারত যাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে, তাদের মধ্যে যদি বাংলাদেশি নাগরিক থেকেও থাকেন, তারপরও তাদের জাতীয়তা ও নাগরিকত্ব পরীক্ষা করে কি গ্রহণ করা হচ্ছে? এরকম অনেক প্রশ্ন জনমনে রয়েছে। সরকার, বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আমরা এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করছি।
অতীতে আমরা ‘নতজানু পররাষ্ট্র নীতি’র কথা শুনেছি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ সেই একই ধরনের পররাষ্ট্র নীতিতে চলবে, সেটি কাম্য নয়।
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন ইস্যুতে যতটা সোচ্চার, পুশ-ইন নিয়ে তাদের সেরকম কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না। তাদেরও উচিত হবে এই ইস্যুতে সরকারের ওপর চাপ বাড়ানো। মনে রাখতে হবে, নির্বাচন তিন মাস পিছিয়ে গেলে দেশের অনেক বড় ক্ষতি হবে না। কিন্তু দেশের সীমান্ত যদি সুরক্ষিত না থাকে, তাহলে দেশের সার্বভৌমত্বই হুমকিতে পড়বে।
সম্পাদক



