জুলাই বিপ্লবের পর যেহেতু পতিত শক্তিকে টাকার বিনিময়ে ভারতে পালাতে সাহায্য করা আর বিভিন্ন রকম লীগ সেজে প্রতিবিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরির কাজগুলো চলছিলো; তাই তখন জুলাই তারুণ্য সেগুলোকে প্রতিহত করতে যে উদ্যোগ নিয়েছে তা প্রয়োজনীয় ছিলো।
কিন্তু জুলাই বিপ্লবের এক বছর অতিক্রান্ত হবার পর; পুলিশ বাহিনী যখন পুনর্গঠিত হয়েছে, সেনাবাহিনী আইন শৃংখলা রক্ষায় সক্রিয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রশাসন ও বিচার বিভাগে ন্যুনতম শৃংখলা ফিরিয়ে এনেছে; তখন ভারত সমর্থিত হাসিনার দোসর বলে কোন সংবাদ বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে জনহামলা অগ্রহণযোগ্য।
আগ্রাসন বিরোধী জুলাই বিপ্লবী ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে বিক্ষুব্ধ তরুণেরা শাহবাগে জড়ো হয়েছে; সারাদেশে বিক্ষোভ করেছে; যা খুবই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতার একটি অংশ প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে নৈরাজ্য ও লুন্ঠন চালানো ছিলো অবিমৃষ্য ও অগণতান্ত্রিক কাজ।
জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট হচ্ছে অহিংস প্রতিবাদ; হাদি গুলিবিদ্ধ হবার সঙ্গে সঙ্গে তরুণদের বিক্ষোভ মিছিল, তার মৃত্যু সংবাদ আসার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগে তরুণ সমাবেশ, হাদির জানাজায় লাখো মানুষের ঢল; এর চেয়ে শক্তিশালী জন ঐক্যের প্রতীক আর কিছুই হতেই পারে না।
কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতার যে অংশটি প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ভাঙ্গচুর করতে গেছে; তারা জনপ্রতিবাদের ভুল ধারাটি বেছে নিয়েছে।
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার জুলাই বিপ্লবের পর থেকে অতসী কাঁচ দিয়ে “জুলাই বিপ্লবীরা কি ভুল করলো” তা দেখতে শুরু করেছে। এদের বাছাই কলামিস্টেরা জুলাই বিপ্লবীদের ছিদ্রান্বেষণ করে অনেক জ্ঞানগর্ভ কলাম লিখেছেন। ভারতের মিডিয়ায় জুলাই বিপ্লবকে উগ্র ইসলামপন্থীদের নৈরাজ্য বলে যে হিন্দুত্ববাদী বয়ান চালু করেছিলো; প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার তাকে সাবসট্যানশিয়েট করেছে। আর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলা সেসব উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণাকে কিছুটা সত্যের ভিত্তি দিয়েছে। হামলাকারীদের তাই আত্মঘাতী বাংলাদেশী বললে অত্যুক্তি হবে না।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবর ও কলাম ভাষায়, বাক্যে ও শব্দে বয়ান সন্ত্রাস চালিয়ে যায়; এর বিপরীতে ভাষা-বাক্য-শব্দে কাউন্টার হেজিমনি গড়ে তোলা পলিটিক্যালি কারেক্ট পন্থা। ফেসবুক যেখানে প্রতিটি মানুষকে কন্ঠস্বর দিয়েছে; তাই সে নিজেই যখন একটি মিডিয়া; তখন সে কোন নির্বুদ্ধিতায় পত্রিকা অফিসে হামলা করে!
হাসিনা পালিয়ে যাবার পর স্বাভাবিকভাবেই কালচারাল উইং-এর মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। ফেসবুকে পনেরো মাস ধরে সেই কান্না আর বিষাদের খোয়াড়ি আমরা দেখতে পাই। এ বিষাদ প্রকাশে ছায়ানট ছিলো সবচেয়ে শৈল্পিক। সে গানে গানে অন্ধকার সময় ও দুঃসময়ের কথা বলেছে; আবার সু’দিন ফিরে আসার জাগরণী গান গেয়েছে। এর বিপরীতে জুলাই তারুণ্য আলোকসম্ভবা ও মুক্ত সময়ের কথা বলতে পারে গানে গানে; আর কখনো দুঃসময় ফিরে আসবে না, এমন জাগরণী গান গাইতে পারে। কালচারাল হেজিমনির বিপরীতে কাউন্টার কালচারাল হেজিমনিই কাংক্ষিত পদ্ধতি। ছায়ানটে হামলা করে হারমোনিয়াম ভেঙ্গে ফেলা তো নৈরাজ্য।
সাম্প্রতিক এই ঘটনা বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য বিরাট শিক্ষা। অল্প কিছু তরুণের উচ্ছৃংখলতা কিভাবে কালচারাল ফ্যাসিজমকে ভিক্টিমহুড প্লে করে; নতুন কালচারাল হেজিমনি শুরুর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে; তা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে।
ভারত সমর্থিত আওয়ামী লীগ তার কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রধান উপাদান হিসেবে প্রচলন করে গেছে, কাঁদো বাঙালি কাঁদো মঞ্চনাটক। নেটফ্লিক্সের গতিশীল নাটক চলচ্চিত্রের যুগে এই শতবর্ষ পুরোনো যাত্রাপালার দর্শক সংখ্যা খুবই কম।
কাঁদো বাঙালি কাঁদো নাটকের প্রধান উপজীব্য হচ্ছে, কুঁচকুঁচানি। সব সময় কুঁচ কুঁচ করতে থাকা। কিভাবে কথা কইতে হবে, কিভাবে ফতুয়া পরতে হবে, কি খাইতে হবে, কি গাইতে হবে জাতিকে এসব শেখানোর স্বপ্রণোদিত ম্যানেজারের সলিলোকি হচ্ছে এই নাটক। জনসংখ্যার খুব ক্ষুদ্র অংশ এই নাটকের দর্শক।
পূর্ব বাংলার সম্পন্ন কৃষক ও কারিগর সমাজের লোক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করে। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণী চাকরি বাকরির চেষ্টা করে। সেই ভাগ্যান্বেষণে কিছু লোক ঢাকায় এসেছিলো। একটা ডিম ছেলে মেয়েকে অর্ধেক করে ভাগ করে খাইয়ে তাদের জীবনে বিরাট কিছু হবার স্বপ্ন দেখায় ঐ ছোট চাকুরে। কলকাতার চলচ্চিত্রের জমিদার চরিত্রে ছবি বিশ্বাসের আভিজাত্য দেখে; এরা আভিজাত্য সম্পর্কে একটা ধারণা পায়। আর কালক্রমে অভিনেত্রী অপর্ণা সেনের সাজ গোজ কথা বার্তা বলার আদুরে ভঙ্গি দেখে; ক্ষুদে চাকুরের ঘরে বড় হতে থাকে ছেলেমেয়েরা। তারাই সংস্কৃতি মামা ও খালা হয়ে ঢাকার সাংস্কৃতিক কাঠামো নির্মাণের কাজে লেগে যায়। আশি ও নব্বুইয়ের দশকে ছবি বিশ্বাস ও অপর্ণা সেনের কপি পেস্ট সংস্করণেরাই কালচারাল আইকন হয়ে ওঠে ঢাকা শহরে। এদের কাজ হচ্ছে কে কতটুকু বিশুদ্ধ বাঙালি হয়ে উঠেছে, তা মাপামাপি।
পূর্ব বাংলা নদীর দেশ, কবিতার দেশ, গানের দেশ; এখানে কর্মমুখর মানুষ মুখে মুখে গীতিকবিতা বেঁধে তাতে সুর বসিয়ে গাইতো। নব্বুই সাল পর্যন্ত দেখবেন বাংলাদেশের কবিতা উতকর্ষ লাভ করে এর স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে। কিন্তু কালচারাল মামাদের আলোকিত মানুষ গড়ার কারখানা ও সৃজনশীল/মননশীল লেখক বাছাইয়ের আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ ও প্রথম আলো এসে পড়ার পর; কাজ কর্ম ছেড়ে একদল লোক সাংস্কৃতিক হয়ে গেলো। সারাদিন শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে পড়ে থেকে আর কোন কাজ কর্ম করতে শিখলো না। কিন্তু দুর্ভাগ্যের ব্যাপার নব্বুই-এর আগের মতো কবিতা-গল্প-গান আর হলো না; তখন আগের সব কবিতা ও গল্প খারিজ করে দিয়ে বোদ্ধা হয়ে বসে রইলো সংস্কৃতি মামারা। বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলন করতে গিয়ে কমার্শিয়াল মুভিকে খারিজ করে দিয়ে চলচ্চিত্র বলে আর কিছু রইলো না। নব্বুই-এর পর যেসব তরুণ বাংলাদেশের জনমানুষের ভাষায় তাদের জীবনালেখ্য নিয়ে টেলিফিল্ম বানাতে গেলো; তখন সেখানে নদীয়ার প্রমিত ভাষা নেই বলে “ওটা সংস্কৃতি দূষণ” বলে রায় দিলো কপি ছবি বিশ্বাসেরা। নতুন প্রজন্ম শুধু হারমোনিয়াম ডুগি তবলার গান শুনছে না বলে; ব্যান্ড সংগীত আর পুরোনো গানের ফিউশন তৈরির চেষ্টা করা হলে; কপি অপর্ণা সেন বলে দিলেন, সংস্কৃতি শেষ হয়ে গেলো। ফলে নব্বুই দশক থেকে আজ পর্যন্ত সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় ঊষর সময় কাটাচ্ছি আমরা। একটা গোষ্ঠীর কোন ক্রিয়েটিভ আউটপুট নেই; অডিয়েন্স নেই; তবু ছবি বিশ্বাসের জিদ, আমার ঊনবিংশ শতকের জমিদার বাড়ির সংস্কৃতি চাই।
একবিংশ শতকে কোন পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ভালো গান গাইবার, ভালো চলচ্চিত্র তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু প্রথম আলোর ঊনবিংশ শতকের জমিদার বাড়ির আঙ্গিকে যে শিল্প তৃষ্ণা; মেরিল পুরস্কারের জন্য সেই তৃষ্ণা মেটানোর জলের ঘটি আনতে গিয়ে; গান-চলচ্চিত্র একটা লক্ষ্মণরেখার মাঝে ঘুরপাক খেতে থাকলো।
নতুন প্রজন্মের তাই সংস্কৃতি মামা খালাদের মেগালোম্যানিয়াকে এতো গুরুত্ব দেবার কিছু নেই। বিশ্বসংস্কৃতির যে এক্সপোজার তরুণদের রয়েছে; তাকে পূর্ববাংলার স্বকীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সোনালি মিশেলে জুড়তে পারলেই; গ্লোবাল অডিয়েন্স বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংগীতে আকৃষ্ট হবে। আর দেশের তরুণেরা তা লুফে নেবে এটা বলাই বাহুল্য।
এখন এই যে সংস্কৃতি মামা খালা; এরা পারিবারিক অনুষ্ঠানে গম্ভীর মুখে বসে যে খালু-ফুপারা বলেন, সব কিছু উচ্ছনে গেলো; এক্সজাক্টলি ঐ ব্যাপার। বয়সের দিকে তাকিয়ে, সামাজিক নর্মস বজায় রাখতে; এমন ফুপা-খালুদের অনেক অযৌক্তিক সমালোচনা সহ্য করে নিতে হয়। আর ক’টা দিনই বা বাঁচবে লোকটা। ভেবে দেখুন এই ভুল ভাল সমালোচনা করার জেদি ও রাগী প্রবীণেরা যখন থাকবে না; তখন কিন্তু তাদের জন্য মন খারাপ লাগবে। একারণেই তাদের যে ঊনবিংশ শতকের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদার বাড়ি; সেখানকার জলসাঘরের ঝাড়বাতি বা হারমোনিয়াম ভেঙ্গে দেয়া; রীতিমত নিষ্ঠুরতা। ঐ একটু অতীত স্মৃতি নিয়ে বাঁচা, ঐ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতিতে একটু বাণী চিরন্তনী পাঠ, ঐ একটু হারমোনিয়াম বাজিয়ে নিধু বাবুর টপ্পা গাওয়া; ঐটুকু আনন্দ নিয়ে আরো কিছুকাল যদি তারা বেঁচে থাকার প্রাণপ্রবাহ পান; তাতে তরুণ প্রজন্মের ক্ষতি কি!
তাই সবকিছুকে আমরা বনাম ওরা করে তেতো করে ফেলা অনুচিত। বরং সুন্দর ভাষায় বিতর্ক করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সহিংসতা নয় অহিংস বিতর্কে আস্থা রাখতে হবে। তরুণদের তৈরি করতে হবে নির্মেদ ও নৈর্ব্যক্তিক মিডিয়া, ভীষণ আনন্দদায়ী সংগীত গৃহ; আর এটা তৈরি করার সময় পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। প্রবীণদের তেতো সমালোচনা দেখে শেখার ব্যাপার হলো; সমালোচনা করে শেখানো যায় না; শেখাতে হয় গভীর ভালোবাসায়।
মাসকাওয়াথ আহসান
এডিটর ইন চিফ, ই-সাউথএশিয়া
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি আর্কাইভ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)





