দ্রুত নির্বাচনের দাবি জোরালো হচ্ছে। বিএনপির তরফে দাবিটা সবচেয়ে বেশি। দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন না হলে এই সরকারকে সমর্থন দেওয়া বিএনপির জন্য ‘কঠিন’ হবে।
সম্প্রতি স্বয়ং সেনাপ্রধানও ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, দ্রুত বা ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবিটি জোরালো হচ্ছে কি শুধু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য?
আমরা মনে করি, প্রশ্নটা শুধু ভোট বা ভোটের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের নয়। বরং প্রশ্নটা পরিবর্তনের।
একটা বিরাট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলো, গত সাড়ে ৯ মাসে তারা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ তথা দেশকে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে কী করেছে বা করতে পেরেছে—তা নিয়ে প্রশ্নের অন্ত নেই।
এই সরকারের গত সাড়ে ৯ মাসে এমন সব কাজ হয়েছে বা এখনও হচ্ছে, যার সঙ্গে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন তথা একটি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। শত শত প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা, ভবন, সড়ক, স্টেডিয়াম এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নামও পরিবর্তন করা হয়েছে—যা এই ক্রান্তিকালে কতটা প্রয়োজন ছিল, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা তার পরিবারের সদস্যদের নামসম্বলিত প্রতিষ্ঠানের নাম বদলের যৌক্তিকতা থাকলেও বা যুক্তি দেয়া গেলেও রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের মতো মানুষের নামও বাদ দেওয়া হয়েছে। বোঝাই যায় যে, এইসব নাম বাদ দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র ওই ব্যক্তিদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার (২২ মে) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১২টি ভবন ও স্থাপনার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। সেই তালিকায় বঙ্গবন্ধু যেমন আছেন, তেমনি আছেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ড. কুদরত-ই-খুদা ও ড. ওয়াজেদ মিয়ার মতো মানুষেরাও। তাদের নামসম্বলিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে নতুন নামে পরিচিত হবে। অথচ খোদ শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলছেন, বেশিরভাগ নাম পরিবর্তন অপ্রয়োজনীয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সুতরাং আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক অবস্থা ঠিক করে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন; দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূরীকরণ; সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা তথা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে যে সরকারের দম ফেলার ফুরসৎ পাওয়ার কথা নয়, তারা যখন রাষ্ট্রীয় আয়োজনে এইসব অপ্রয়োজনীয় কাজ করে; সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দল, সংগঠন ও ব্যক্তিদের অনেকে যখন বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন বয়ান তৈরির চেষ্টা করে এবং সেখানে সরকার যখন নিরব থাকে—তখন সরকারের ‘ইনটেনশন’ বা নিয়ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
সরকার গত সাড়ে ৯ মাসে কেন মব বন্ধ করতে পারলো না, সেটি আরেকটি বড় প্রশ্ন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, তথ্য উপদেষ্টা এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্তরা বারবার মবের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিলেও এখন পর্যন্ত মব বা জনবিশৃঙ্খলা পুরোপুরি বন্ধ করা গেছে—সরকার সেই দাবি করতে পারবে না।
সুতরাং, এই মুহূর্তের বাংলাদেশে প্রশ্নটা শুধু নির্বাচনের নয়। মানুষের জীবনমান উন্নত করা তথা জনমনে যে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হয়েছে, সেটি এখন প্রধান বিবেচ্য। সরকার যদি সত্যিই জমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারতো; বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে যদি সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি না হতো; সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় নাগরিকরা গিয়ে যদি আগের চেয়ে কিছুটা হলেও উন্নত সেবা পেতো এবং ঘুষ-অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে সরকার সত্যিই দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতো—তাহলে হয়তো সরকারের ওপর নির্বাচনি চাপটা কম হতো। কোনো রাজনৈতিক দল দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নির্বাচনের চাপ দিলেও জনগণই তখন সরকারের পক্ষে দাঁড়াতো। কিন্তু দলমতনির্বিশেষে জনগণ সরকারের পক্ষে দাঁড়াবে—সেই অবস্থা সরকার গত সাড়ে ৯ মাসে তৈরি করতে পেরেছে কি না, সেই আত্মজিজ্ঞাসাটা খুব জরুরি।
(অনুমতি ব্যতীত লেখাটি কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ)
প্রশ্নটা শুধু নির্বাচনের নয়…
- Advertisement -





