রবিবার, মার্চ ১৫, ২০২৬

ফেব্রুয়ারির ভোট হোক গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম ধাপ

spot_img

ভিডিও

- Advertisement -

বাংলাদেশের সংবিধানে প্রজাতন্ত্র বা রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক ঘোষণা করা হয়েছে জনগণকে। জনগণ সেই ক্ষমতার প্রয়োগ করে মূলত নির্বাচনে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। সুতরাং, যখন জনগণ ভোট দিতে পারে না বা নির্বাচন পদ্ধতিটি প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়, তখন সেটি আর যেমন নির্বাচন থাকে না, তেমনি ভোটাধিকার বঞ্চিত জনগণকেও আর প্রজাতন্ত্রের মালিক বলা যায় না।

গত বছরের ৫ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কারের পাশাপাশি দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের দাবিটি জোরালো হয়েছে—যা সাম্প্রতিক মাসগুলোয় আরও বেশি তীব্র হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১০ মাসে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সীমান্তে ভারতের পুশ-ইন ঠেকাতে না পারার ব্যর্থতা এবং তার সাথে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে স্থলপথে মিয়ানমারের রাখাইনে যাওয়ার জন্য করিডোর বা মানবিক চ্যানেল ও চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার উদ্যোগের মতো ঘটনায়।

জনগণের একটি বিরাট অংশের মধ্যে এই বিশ্বাস ও ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এই সরকার গত ১০ মাস ধরে সংস্কারের নানা আশার বাণী শোনালেও কার্যত জনগণের জীবনমান উন্নয়নে তথা গত বছরের আগস্টপূর্ববর্তী অবস্থার চেয়ে জনজীবন অধিকতর স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে পারেনি। ফলে শুরুতে এই সরকারের প্রতি মানুষের যে বিপুল সমর্থন ও প্রত্যাশা ছিল, সেটি ধীরে ধীরে কমেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকরাও হয়তো সেই বাস্তবতাটি উপলব্ধি করতে পারছেন।

এরকম বাস্তবতায় শুক্রবার বাংলাদেশ সময় দুপুরে লন্ডনের একটি হোটেলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং এই সময়ের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে অনুষ্ঠিত একান্ত বৈঠক শেষে যে যৌথ ঘোষণা প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, দুজনের বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে। তারেক রহমান আগামী রোজার আগে নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও মনে করেন এই সময়ে ভোট হলে ভালো হয়। যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টাও মনে করেন, সব প্রস্তুতি শেষ করা গেলে আগামী বছর রমজান শুরুর আগের সপ্তাহেই নির্বাচন হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সংস্কার ও বিচারে পর্যাপ্ত অগ্রগতি‌ হতে হবে।

নির্বাচনের রোডম্যাপ ইস্যুতে নিশ্চয়ই এটি একটি বড় অগ্রগতি। কেননা বিএনপি অনেক দিন ধরেই বলে আসছিল, নির্বাচন ডিসেম্বরেই হতে হবে। আর সম্প্রতি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, নির্বাচন এপ্রিলের প্রথমার্ধে হবে। কিন্তু এপ্রিলে নির্বাচন করা যে নানা কারণেই চ্যালেঞ্জিং, সেটি বিএনপির পক্ষ থেকে তো বটেই, আরও অনেক দল ও নাগরিক প্লাটফর্ম থেকে বলা হয়েছে। সেই অবস্থায় ডিসেম্বর ও এপ্রিলের মাঝামাঝি ফেব্রুয়ারির প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে, অর্থাৎ রোজা শুরুর আগেই যদি জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি করে ফেলা যায়, তাহলে সেটি দেশের জন্য মঙ্গল।

এই বৈঠকের পরে বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্রে শোনা যাচ্ছে, নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি। যদিও নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনের চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। ইউনূস-তারেক বৈঠক শেষে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেছেন, শিগগিরই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবে ইসি।

এটা ঠিক যে, নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ হলেও নির্বাচনই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা সুনিশ্চিতের একমাত্র উপায় নয়। বরং রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। পরমতসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামো এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা না গেলে শুধু নিয়মিত বিরতিতে নির্বাচন দিয়েই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে নিয়মিত বিরতিতেই নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্রের যে আকাঙ্ক্ষা—তা এখনও পূরণ হয়নি। বরং গণতন্ত্রের মোড়কে একধরনের স্বৈরতন্ত্র তথা দলীয় শাসন দেখেই দেশের মানুষ অভ্যস্ত—যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অনুপস্থিত।

সুতরাং, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি শুধুমাত্র একটি ক্ষমতার পালাবদল হয়ে যায়; যদি অতীতের সরকারগুলোর মতো দেশে একদলীয় এবং পরিবারকেন্দ্রীক রাজনীতি ঘুরপাক খেতে থাকে; যদি উন্নয়নের নামে লুটপাটের মহোৎসব চলতে থাকে; যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মতোই দলীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে; রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো যদি আগের মতোই বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হিসেবেই কাজ করতে থাকে—তাহলে প্রমাণ হবে যে, ওই নির্বাচন গণতান্ত্রিক উত্তরণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

এমতাবস্থায়, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে জুলাই সনদ তৈরি হওয়ার কথা, সেখানে নির্বাচনের পরে গঠিত সরকার কীভাবে ও কোন প্রক্রিয়ায় দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে, তার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্মসূচি লিপিবদ্ধ থাকতে হবে। সেখানে এমন একটি আইনি বাধ্যবাধকতা ও কমিটমেন্ট থাকতে হবে, যাতে বিজয়ী দল সরকার গঠন করেই ওই সনদ ছুঁড়ে ফেলতে না পারে। যাতে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের জন্য ১১টি কমিশন যে প্রতিবেদনগুলো দিয়েছে, সেগুলো সরকারি দপ্তরের অন্ধকার আলমিরার ভেতরে কেজি দরে বেচে দেওয়া কাগজে পরিণত না হয়। বরং কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশগুলোর মধ্য থেকে যেগুলো সত্যিই দেশ ও জনগণের জন্য প্রয়োজনীয়; গণতান্ত্রিক উত্তরণে আবশ্যক, সেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও থাকতে হবে।

সম্পাদক

- Advertisement -
spot_img

আলোচিত

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

ভিডিও