গত কয়েক দিনে স্বর্ণ ও রুপার বাজারে তীব্র ওঠানামা দেখা গেছে। টানা এক বছর ধরে বড় ধরনের উত্থানের মাধ্যমে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর শুক্রবার ও সোমবার মূল্যবান এই দুই ধাতুর দাম হঠাৎ করেই বড় আকারে কমে যায়। মঙ্গলবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও দাম এখনো আগের সর্বোচ্চ অবস্থানের অনেক দূরে রয়েছে।
স্বর্ণ ও রুপা ঐতিহ্যগতভাবে এমন সম্পদ, যেগুলোকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ে মূল্য ধরে রাখার মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। গত এক বছরে বাজারে অস্থিরতার বড় উৎস ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত অনিশ্চয়তা। শুল্কনীতি, ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে চাপ, এমনকি গ্রিনল্যান্ড ইস্যুর মতো বিতর্কিত অবস্থান- এসব কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ে।
এর পাশাপাশি ডলারের দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করে। ট্রাম্পের শপথের পর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত সময়ে স্বর্ণের দাম প্রায় দ্বিগুণ এবং রুপার দাম প্রায় চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রুত বাড়তে থাকা সরকারি ঋণের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার ঘাটতিও এই উত্থানের পেছনে বড় কারণ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
প্লেনিসফার ইনভেস্টমেন্টসের কৌশল প্রধান দিয়েগো ফ্রানজিন বলেন, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার অধিকাংশ সম্পদের সঙ্গে ঋণঝুঁকি জড়িত থাকলেও স্বর্ণ এমন সম্পদ যার কোনো প্রতিপক্ষ নেই- এ কারণেই এটি নিরাপত্তার প্রতীক।
গত শুক্রবার হঠাৎ করেই বাজারের গতি বদলে যায়। স্বর্ণ প্রায় ১০ শতাংশ এবং রুপা প্রায় ২৮ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। সোমবার পতন অব্যাহত থাকে। পতনের কারণ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ট্রাম্পের কিছু সাম্প্রতিক ইঙ্গিত বাজারে স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তিনি ফেডের নেতৃত্বে তুলনামূলকভাবে প্রচলিত ধারার কেভিন ওয়ার্শকে মনোনয়ন দেওয়ার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে ইরান ইস্যুতে সমঝোতার আশা প্রকাশ করেন। এতে বিনিয়োগকারীরা ধারণা করেন, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে এবং ডলার শক্তিশালী হতে পারে। ফলে অনেকেই নিরাপদ সম্পদ বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেন।
তবে অন্য বিশ্লেষকদের মতে, দাম অস্বাভাবিক দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সংশোধন ছিল অনিবার্য। জুলিয়াস বেয়ারের গবেষণা প্রধান মার্ক ম্যাথিউজ বলেন, আগের সপ্তাহে দাম প্রায় উল্লম্ফনমূলক হারে বেড়েছিল; মুনাফা তোলা শুরু হলে পতন দ্রুত ত্বরান্বিত হয়।
বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন হলেও, অনেক বিশ্লেষক মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান বজায় রেখেছেন।
জেপি মরগ্যানের মতে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ স্বর্ণের দাম আরও বাড়তে পারে। তাদের ভাষায়, স্বর্ণ এখনো বহুমুখী বিনিয়োগ সুরক্ষা মাধ্যম।
জুলিয়াস বেয়ারের ম্যাথিউজের মতে, বাজার স্থিতিশীল হয়েছে- এমন বিশ্বাস ফিরে এলে বিনিয়োগকারীরা আবার স্বর্ণ ও রুপা কিনতে পারেন। ডলারের সম্ভাব্য দুর্বলতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মজুত বৃদ্ধির প্রবণতা এখনো বহাল রয়েছে।






