অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড মুহম্মদ ইউনুস ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের ম্যান্ডেট নিয়ে যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন; তা পালনে তিনি সফল হয়েছেন।
সাবেক ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনার দলের শীর্ষ নেতারা আশংকা প্রকাশ করতেন যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হলে লাখ লাখ আওয়ামী লীগ কর্মী জনরোষে নিহত হবে।
অথচ জুলাই বিপ্লবের পর ড ইউনুসের সরকার কুশলতার সঙ্গে সেই নৈরাজ্য রোধ করেছেন।
ড ইউনুস যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন; তখন পুলিশ বাহিনী হাসিনার নেতৃত্বে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত। কেবল সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি রক্ষা নিঃসন্দেহে ছিলো দুরুহ একটা কাজ। সেনাবাহিনী সেই কৃতিত্বের অংশীদার। শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা জেনারেল তারেক সিদ্দিকীর মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে প্রতিবেশী ভারতের যে প্রভাব তৈরি হয়েছিলো; তাকে নিষ্ক্রিয় করে সেনাবাহিনী তার বাংলাদেশ সংকল্পে যেভাবে ঋজু ভূমিকা রেখেছে; তা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার।
ভারত সমর্থিত আওয়ামী লীগের প্রভাব দেশের মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জারি থাকায়; ড ইউনুসকে ডিফেম করতে ভারতীয় ও বাংলাদেশী মিডিয়া সদা ততপর ছিলো। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ইউনুসের মতো একজন পরীক্ষিত লিবেরেলকে ইসলামপন্থী তকমা দিয়েছে প্রতিদিন। কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকেরা ঐ শিকারী মিডিয়া ও কালচারাল উইং-এর ডিফেমেশন বা মানহানিকর প্রচারণা উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সমর্থন জুগিয়ে গেছে।
ভারতের মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া ইউনুসকে ব্যর্থ প্রমাণে অবিরাম গুজব ছড়িয়েছে। বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকাররা ঐ গুজবগুলোকে চিহ্নিত করেছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং-কে বাধ্য হয়ে ফ্যাক্টচেকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার, মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী বলয় প্রতিমুহূর্তে বাংলাদেশে উগ্র ইসলামপন্থা উত্থানের নেসেসারি ইলিউশন তৈরির চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশে ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় চলা মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক বলয় সেই মিথ্যা ভারতীয় বয়ানকে সাবস্ট্যানশিয়েট করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ড ইউনুসের শক্তির জায়গা তার যোগাযোগ সক্ষমতা। তিনি প্রতিনিয়ত স্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরায়; পশ্চিমা বিশ্ব ও মিডিয়া ভারতের ইসলামোফোবিক লেন্সে বাংলাদেশকে না দেখে; নিজেদের চোখে দেখেছে। ফলে ভারতীয় মিথ্যা প্রচারণা ধোপে টেকেনি।
ড ইউনুস প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিকে আস্থায় রাখতে নিয়মিত তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সর্বদলীয় বৈঠকে রাষ্ট্র সংস্কার সংক্রান্ত ধারাবাহিক আলোচনা ভবিষ্যত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠার রোড ম্যাপ তৈরির চেষ্টা করেছেন।
ভারত, পতিত আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশে তাদের কালচারাল ফ্যাসিস্টেরা আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে তাদের ফ্যাসিস্ট চেতনায় বিনির্মাণের চেষ্টা করে চলেছে। ফলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিতের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বসেছিলো বিএনপি। আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের বাক্সে জড়ো করতে বিএনপির নেতাদের অনেকেই কথা বলতে শুরু করে ভারত মনোরঞ্জক আওয়ামী বয়ানে। ভারত বাংলাদেশে তার ছায়া উপনিবেশ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে বিএনপির মাঝে নিজেদের প্রতিপত্তি ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা খুঁজতে থাকে। ভারতের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মিডিয়ায় বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের প্রতি ভারতীয় সমর্থন প্রকাশ্য হতে থাকে। ভারতীয় প্রশাসন ২০০৯-২৪ (৫ অগাস্ট) যেভাবে প্রতিটি নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশে তাদের স্নেহধন্য মিডিয়া, সিভিল-মিলিটারি প্রশাসনে সক্রিয় অপারেটিভ, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজে ক্রিয়াশীল এসেটদের সিগন্যালিং করে এসেছে; একইভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার ঢাকাস্থ ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে দিয়ে বার্তা পাঠিয়ে সিগন্যালিং করেছেন, তারেক রহমানের মাঝেই দিল্লি বাংলাদেশের ভবিষ্যত দেখছে।
অন্তর্বর্তীকালীন ড ইউনুস যেহেতু বাংলাদেশের ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রিক্লেইম করে; ভারতীয় ছায়া উপনিবেশ উতখাত করেছেন; ফলে বাংলাদেশে ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে ড ইউনুস হয়ে উঠেছেন; ভারতের চোখে সবচেয়ে বড় শত্রু।
বাংলাদেশের ঘাড়ের ওপর আরব রজনীর দৈত্যের মতো শ্বাস নিতে থাকা ভারতীয় আগ্রাসন প্রত্যাখান করেই ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিলো। ফলে সেই বিপ্লবের ম্যান্ডেটে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচিত হওয়া ইউনুস আর জুলাইয়ের বিপ্লবী তারুণ্য ভারতের চক্ষুশূল। বাংলাদেশের নাগরিকেরা সার্বভৌমত্বকে নিজের জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে ইউনুস ও জুলাই তারুণ্য সার্বভৌমত্বের প্রিয় প্রতীক হিসেবে আদৃত।
জুলাই তারুণ্যের রাজনৈতিক দল এনসিপি প্রথমে এককভাবে আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিলেও; ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধী সাংস্কৃতিক নেতা ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর; ভারতীয় মিডিয়ার উল্লাস, হাদিকে কট্টর ইসলামপন্থী হিসেবে ডিফেম করার চেষ্টা, আর দেশের অভ্যন্তরে কোন কোন মহলের একই ধরণের প্রবণতা চিহ্নিত করে; ভারত প্রশ্নে ও রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে ঐক্যের ভিত্তিতে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী কৌশলগত জোট করে। ধর্মপন্থী ও মধ্যপন্থী দলের মিশেলে গড়ে ওঠা এই জোট আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
ড ইউনুস বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান, জামায়াতের শীর্ষ নেতা শফিকুর রহমান ও এনসিপির শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলামের সঙ্গে নিয়মিত উষ্ণ বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের প্রত্যাশায় তার সক্রিয়তা জারি রেখেছেন।
জুলাই বিপ্লবে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা ও তার দোসরেরা ভারতের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে; নির্দেশনা ও টাকাপয়সা দিয়ে বাংলাদেশে নাশকতা ঘটিয়ে বিশেষত সংখ্যালঘু হিন্দুদের গৃহে আগুন দেবার মতো ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আসন্ন নির্বাচনকে ভণ্ডুল করে দিতে মরিয়া। বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি যে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে; তাতে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে; বাংলাদেশে ভারত সমর্থিত আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা।
সেদিক থেকে আসন্ন নির্বাচনটি হয়ে উঠছে ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় আরেকটি ব্যালট বিপ্লব। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে যে সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বাংলাদেশের পুনর্জন্ম হয়েছে; তা নতুন বাংলাদেশের সংকল্পে ঋজু থাকবে; নাকি আবারো ভারতের ছায়া উপনিবেশে নতুন কোন ফ্যাসিজমের অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে; তা নির্ধারিত হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে। বাংলাদেশের নিয়তি নির্ধারিত হবে নাগরিকদের সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
মাসকাওয়াথ আহসান
এডিটর ইন চিফ, ই-সাউথএশিয়া
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি আর্কাইভ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)





