বাজেট মানেই প্রশাসন পরিচালনা ও উন্নয়নে সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা। রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট কিংবা ভবনেই উন্নয়ন সীমাবদ্ধ। তবে এবারই প্রথম এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসছে সরকার। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তবর্তী সরকারের ঘোষিত বাজেটে নতুন দর্শন তুলে ধরেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি-কেন্দ্রিক ধারণা থেকে সরে এসে আমরা চেষ্টা করেছি সামগ্রিক উন্নয়নের ধারণায় জোর দিতে। তাই প্রথাগত ভৌত অবকাঠামো তৈরির খতিয়ান তুলে ধরার পরিবর্তে আমরা এবারের বাজেটে প্রাধান্য দিয়েছি মানুষকে।
অর্থাৎ তিনি ইট-পাথর নয় মানুষকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এজন্য মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, জীবিকার নিরাপত্তা এবং বৈষম্যহীন পরিবেশের কথা তুলে ধরে বলেন, এ অত্যাবশ্যক উপাদানগুলো ছাড়া যে কোন রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে পড়ে, দুর্বল হয় সমাজের ভিত। তাই রাষ্ট্রের ভীতকে শক্তিশালী করতে অর্থ উপদেষ্টা, এবারের বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন, নাগরিক সুবিধা, কর্মসংস্থান ইত্যাদি বিষয়ের উপর বিশেষ জোর দেয়ার কথা বলেছেন।
এবারে ব্যক্তিক্রম হলো স্বল্প মেয়াদী অন্তরবর্তী সরকারের দীর্ঘ মেয়াদি বাজেট পরিকল্পনা প্রস্তাব। এর অংশ হিসেবে আগামী তিন অর্থবছরের জন্য করনীতি, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা। যদিও বাজেট বক্তৃতায় অর্থ উপদেষ্টা স্বল্প মেয়াদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর।
তবে, এটাও ঠিক ব্যবসায়ী মহল থেকে বহু বছর তাগাদা ছিল কয়েক বছরের করনীতি এক সঙ্গে ঘোষণা করলে তাদের ভবিষ্যত ব্যবসা পরিচালনা ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা সহজ হয়। তবে ব্যক্তি আয়ের ক্ষেত্রে করমুক্ত সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকাতেই রাখার সমালোচনা করেছে ব্যবসায়ী সংগঠন ঢাকা চেম্বার। সোমবার এক বাজেট প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটি বলেছে, করমুক্ত আয় সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা উচিত।
তবে ২০২৬-২৭ করবর্ষের জন্য করমুক্ত আয় সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার করার প্রস্তাব করেছেন অর্থ উপদেষ্টা। এক্ই বছরে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ গেজেটভুক্ত আহত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয় সীমা করা হয়েছে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে অনেকের মনে প্রশ্ন, যেখানে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদধারী নিয়ে এখনো ভুগছে দেশ, সেখানে জুলাই যোদ্ধাদের গেজেটভুক্ত করার ক্ষেত্রে ভুল-ত্রুটি হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়।
২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে স্বল্পন্নোত দেশ বা এলডিসি তালিকা থেকে চুড়ান্ত ভাবে বেরিয়ে আসবে বাংলাদেশ। প্রস্তাবিত বাজেটে সেই প্রস্তুতির কিছু দিক তুলে ধরেছেন অর্থ উপদেষ্টা। যার মধ্যে আছে স্থানীয় বহু শিল্পের কর সুবিধা কমিয়ে আনা। বিভিন্নখাতের কর অব্যাহতি সুবিধা চলতি বছরের জুনের পর আর না বাড়ানো। আমদানি শুল্ক যৌক্তিকীকরণ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বাড়াতে শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্ত। দেশটি কিছুদিন আগেই বাংলাদেশসহ বহু দেশের উপর চড়া শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছিল। যদিও তা তিন মাসের জন্য স্থগিত রয়েছে।
লডিসি প্রস্ততি নিয়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে যে সমালোচনা আসছে, তা হলো সক্ষমতা অর্জন না করেই বিগত সরকারের মত অন্তর্বর্তী সরকারও একই পথে হাঁটছে। কিন্তু সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সুশাসন প্রতিষ্ঠায়। সেদিকে নজর দেয়ার কথা জানানো হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এদিকে বাজেট নিয়ে অর্থনীতিবিদদের সমালোচনা হলো, আগের সরকারের রেখে যাওয়া জিডিপির হিসেবেই নতুন বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে।
অথচ তাদেরই অনেকে শ্বেতপত্রে গত সরকারের দেয়া তথ্য উপাত্ত, বিশেষ করে জিডিপিকে অলিক সংখ্যা বলেছেন। তাহলে এই তথ্য উপাত্তের উপর ভর করে কেন বাংলাদেশকে এলডিসি উত্তরণ করতে হবে, সেই প্রশ্নও জনগণের মাঝে চলে আসে। তবে এলডিসি পরবর্তী সক্ষমতা বাড়াতে কাস্টমস এর পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাইজেশন এর কথা বলেছেন অর্থ উপদেষ্টা। যদিও এই দপ্তরের দুর্নীতির অভিযোগ হরহামেশাই থাকে। এখাতে সুশাসন বাড়াতে পারলে দেশের ব্যবসার পরিবেশ পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে।
দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম বাজেটের আকার আগের বছরের তুলনায় বাড়েনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিততে টান পড়তে পারে, যা সাড়ে ৫ শতাংশের মত হবে বলে ধারণা দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা। যদিও কর্মসংস্থান বাড়াতে আগ্রহী অর্থ উপদেষ্টা।
কিন্তু প্রবৃদ্ধি কমা মানে বিনিয়োগ কমা, আর বিনিয়োগ কমা মানে কাঙ্খিত কর্মসংস্থান না হওয়া। যদিও উপদেষ্টা তার বক্তব্যে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, এলডিসি হতে উত্তরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমাগত যে সকল সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে তার সুবিধা ভোগ এবং যে সকল চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে তা মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার দিকেও মনোযোগ দেয়ার কথা জানিয়েছেন।
বাজেটে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকারের প্রস্তাবিত নানা পরিকল্পনা। এর মধ্যে আছে, এলএনজি আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা, যার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে শিল্পখাতে। এছাড়া বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ১০ শতাংশ কমিয়ে ভর্তুকি হ্রাসের কথা বলা হয়েছে। এটা বাস্তবায়ন করতে গেলে হাত দিতে হবে বিদ্যুৎখাতের অনিয়ম, দুর্নীতিতে। যার সুফল হয়তো জনগণ পাবে। এছাড়া সংকট নিরসনে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দ্রুত শেষ করার কথা বলেছেন অর্থ উপদেষ্টা।
এর বাইরে অভ্যন্তরীণ উদ্যোগে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের পরিকল্পনার কথা বলেছেন তিনি। আগামী দুই অর্থবছরে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাপেক্স ৬৯টি কূপ খনন এবং ৩১টি কূপের ওয়ার্কওভার সম্পন্ন করবে। অন্যদিকে, অপরিশোধিত তেলের চাহিদা মেটাতে ৩০ লাখ টন শোধন ক্ষমতাসম্পন্ন রিফাইনারি স্থাপন করা হবে। তবে এসব পরিকল্পনাই দীর্ঘ মেয়াদী। তাই আবারো সেই প্রশ্ন চলে আসে, স্বল্প মেয়াদী সরকারের দীর্ঘ মেয়াদী বাজেট পরিকল্পনা।
এবার মোট বাজেটের ৩০ শতাংশ ব্যয় হবে মাত্র দুটি খাতে। একটি সুদ পরিশোধ, অন্যটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। প্রথমটির জন্য বরাদ্দ ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, আর দ্বিতীয়টির জন্য প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। সুদ পরিশোধের ব্যয় মূলত আগের সরকারের করা বিপুল ঋণের বোঝা টেনে নেয়ার অংশ। তবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে শুভঙ্করের ফাঁকি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি অর্থ উপদেষ্টা।
কারণ ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে ২৫ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকাই ব্যয় হবে সরকারি কর্মচারিদের পেনশন দেয়ার জন্য। আবার, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় মোট বরাদ্দ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা কম। চলমান অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৬ কোটি টাকা। তবে বিধবা, বয়স্ক, প্রতিবন্ধীদের ভাতা কিছুটা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন অর্থ উপদেষ্টা। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় মাসে সাড়ে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকার এই ভাতা একজন মানুষকে কতটা মানুষের প্রাধান্য দেয় সেই প্রশ্নও থেকে যায়।
ফরহাদ হোসেন তালুকদার
গণমাধ্যমকর্মী ও সাবেক কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, ইআরএফ
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি আর্কাইভ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
বাজেট ২০২৫-২৬: মানুষে প্রাধান্য
- Advertisement -





