সোমবার, মে ১৮, ২০২৬

বিলম্বিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের লাভ?

spot_img

ভিডিও

- Advertisement -

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বর থেকে ২০২৬  সালের জুনের মধ্যে নির্বাচন ইস্যুতে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যেও নানাবিধ আলোচনা চলছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর দেওয়া না দেওয়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অনেকেই ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বলছেন, এই অন্তর্বর্তী সরকার শিগগির নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা থেকে চলে যাবে না।

জনগণের এই ধারণা আরও গতি পায় গত ২ এপ্রিল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশের পর। সেখানে দলের নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ এবং এর রাজনৈতিক নিবন্ধন বাতিল করে গণহত্যার জন্য বিচার করতে হবে। তার আগে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হবে না।

শেখ হাসিনার বিদায়ের ৯ মাস মাস অতিবাহিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিচার এবং এর নেতাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে। ফলে দ্রুত এই বিচার প্রক্রিয়া শেষ হবে বলে মনে হয় না। সুতরাং এনসিপির দাবি অনুযায়ী বিচারের আগে যদি নির্বাচন না হয় তাহলে খুব শিগগির নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই। নির্বাচন না হলে ড. ইউনূস দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে যাবেন। যদিও এগুলো সবই সম্ভাবনা অথবা শঙ্কা।

এনসিপি তাদের রাজনৈতিক দাবি করতেই পারে। তাদের দাবির সাথে রাজনৈতিক সুবিধার দৃষ্টিভঙ্গি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আবেগ।

আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের নেতাদের যেভাবে নির্যাতন করেছে, নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে, পঙ্গু করেছে তাতে ওই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল এনসিপি যদি দাবি করে যে, আওয়ামী লীগের বিচারের আগে নির্বাচন হবে না বা হতে দেওয়া হবে না, সেটি তাদের অবস্থান থেকে অযৌক্তিক নয়। তাছাড়া এনসিপির নেতারা বয়সে তরুণ। তাদের মধ্যে আবেগ বেশি থাকবে সেটিও স্বাভাবিক। মূলত শিক্ষার্থী ও তরুণদের এই আবেগের কারণেই বাংলাদেশে বারবার স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়েছে।

আইয়ুব খানবিরোধী আন্দোলনে আসাদের মৃত্যু, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নির্বিচার গণহত্যা, ১৯৯০ সালে নূর হোসেন ও ডা. মিলন হত্যা এবং সর্বশেষ কোটাবিরোধী আন্দোলনে আবু সাঈদ হত্যার ঘটনা নিরীহ শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশিদের আবেগে আপ্লুত করে। সেই আবেগই জনস্রোতে রূপান্তরিত হয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটায়। এটিই বাংলাদেশের ইতিহাস।

যাই হোক, রাজনৈতিক দল হিসেবে এখনও নিবন্ধন পায়নি এনসিপি। তাই এনসিপি যে নির্বাচনের দিকে আছে সে কথা বলার মতো অবস্থা হয়নি। বরং নির্বাচন যেন বিলম্বিত হয় সেটিই দলের নেতারা চাইবেন। তারা যদি মনে করতেন জনগণ তাদের ওপর খুশি, ড. ইউনূসের ওপর খুশি, তাহলে একটি অবাধ-সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারের আমলেই আওয়ামী লীগের বিচার করার কথা বলতেন।

শুধু এনসিপি নেতারা নন। দেশের একটি গ্রুপের মধ্যে এমন আলোচনা আছে যে, নির্বাচন দরকার নেই। নির্বাচন হলে আবার সেই পুরাতন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেই দেশ চলে যাবে। সংঘাত, দলীয়করণ, দুর্নীতি, ইত্যাদি।

এনসিপি নেতাদের কথা খুবই কর্তৃত্ববাদী এবং উগ্রমেজাজের বললে খুব একটা ভুল হবে না। তারা এমন করে কথা বলেন, যেন দেশে কী হবে সেটি নির্ধারণ করার দায়িত্ব একমাত্র তাদেরই। জনগণ কিছু নয়। তারাই জনগণ।

হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে দেশের মানুষ ছাত্রদের নেতৃত্ব মেনেছিল বলে এখনও তাদের সব কিছুই দেশের মানুষ গ্রহণ করবে—এই চিন্তা খুবই কাচা রাজনৈতিক হিসাব।

তাদের মাথায় এটি নেই যে, বাংলাদেশের আর দশটি রাজনৈতিক দলের মতো তারাও একটি রাজনৈতিক দলমাত্র, সরকার নয়। দিলীপ বড়ুয়ার সাম্যবাদী দলের সাথে এনসিপির পার্থক্য হতে পারে কেবলমাত্র জনগণের ভোটের মাধ্যমে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে সেটি নির্ধারিত হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। তাই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে গেলে নির্বাচন করে জয়ী হতে হবে। অন্য কোনো উপায়ে নয়।

আওয়ামী লীগের বিচারের আগে নির্বাচন নয়—এই কথার আরেকটি ব্যাখ্যা হতে পারে এরকম, ডিসেম্বরে নির্বাচন হলে এনসিপি ক্ষমতায় আসতে পারবে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। তাই তারা চায় এই অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকুক এবং তারা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পেয়ে দলকে গোছাবে এবং যখন তারা মনে করবে যে ক্ষমতায় আসতে পারবে, তখনই নির্বাচনের কথা বলবে।

এর মধ্যে বিএনপি চাঁদাবাজি, মারামারি, খুনোখুনি করে নিজেদের ইমেজ নষ্ট করবে এবং এর লাভ এনসিপির ঘরে যাবে—এমন ধারণাও আছে অনেকের মধ্যে।  

তবে এই ধারণাও খুব অপরিপক্ক। বিএনপি একটি বিরাট রাজনৈতিক দল। নির্বাচন দেরি হলে বিএনপি আরও শক্তিশালী হবে এমন সম্ভাবনাই বেশি। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপিই দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি যার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাবে।

আওয়ামী লীগের বিচার নিয়ে দেশের মানুষের আপত্তি নেই। বিচারিক প্রক্রিয়া তার গতিতে চলবে এবং নির্বাচন চলবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়। দুটোকে মিলেয়ে ফেললে সমস্যা বাঁধবে, নির্বাচন বিলম্বিত হবে।

কিন্তু নির্বাচন বিলম্বিত হলে কার লাভ? এনসিপির নাকি আওয়ামী লীগের?

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের মানুষ খুব তাড়াতাড়ি পরিবর্তন চায় এবং সেটি নির্বাচনের মাধ্যমে।

ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বস্তরে কানাঘুষা চলছে, ইউনূস সাহেব ক্ষমতা ছাড়তে চান না।

কিন্তু এভাবে আর বেশিদিন চললে সবাই বলতে শুরু করবে ‘ইউনূস সম্পর্কে হাসিনার কথাই ঠিক ছিল।’ বিপত্তি ঘটবে সেখানেই। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করলে সেটি আরও জনপ্রিয় হবে। আর আওয়ামী লীগ জনপ্রিয় হলে কি হবে একটু চিন্তা করে দেখুন।

নির্বাচন যত দেরিতে হবে, ড. ইউনূস ক্ষমতা হস্তান্তর যত প্রলম্বিত করবেন, দেশের মানুষ আওয়ামী লীগের অপকর্মের কথা ততই ভুলে যেতে থাকবে। এনসিপির পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের অপকর্ম প্রচার করে কোনো লাভ হবে না।

উদাহরণ আছে, আওয়ামী লীগও কথায় কথায় বিএনপি-জামায়াতের ‘অপকর্মের’ কথা বারবার বলেছে। যত বলেছে উল্টো তারা ততো শক্তিশালী হয়েছে। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে দলটিকে আরও শক্তিশালী করেছে আওয়ামী লীগ।

বাংলাদেশে নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়। একটি উৎসব এবং জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার একটি উপায়। এই সময়টিতেই দেশের মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে গুরুত্ব পায়। নির্বাচনের দিনে মানুষ এদেশের নারীরা নতুন পোশাক ও গহনা পরে ভোট দিতে যায়।

বাংলাদেশের ইতিহাস শিক্ষা দেয়, যে দল অথবা গোষ্ঠী নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করেছে, জালিয়াতি করার চেষ্টা করেছে, তাদেরই পতন হয়েছে। সর্বনাশ হয়েছে। ইতিহাসে তাদের কালো অধ্যায় সূচিত হয়েছে।

সবার মনে রাখা উচিত, রাষ্ট্র কারো আবেগ ও সুবিধামতো চলে না, চলবে না। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সাথে কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য জড়িত। এখানে সবার কথা বিবেচনায় রেখেই পদক্ষেপ নিতে হয়। এনসিপির দাবি অনুযায়ীই দেশে নির্বাচন হবে না অথবা হবে—এটি ভাববেন না। ভাবলে বিপদে পড়বেন। 

রাষ্ট্র কোনো দলের নয়, দেশের মানুষের। আওয়ামী লীগ পুরো দেশকে তাদের মনে করে যাচ্ছেতাই করেছে। এর ফলাফল ভোগ করতে হয়েছে দলটিকে। যে শেখ হাসিনা বারবার বিএনপি-জামায়াত, জাতীয় পার্টিকে গণআন্দোলনের কথা বলে কটাক্ষ করতেন, সেই শেখ হাসিনাই গণঅভ্যূত্থানের শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন

এনসিপি চাইতে পারে যে অধ্যাপক ইউনূস পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকবেন। সেক্ষেত্রে তাকে ক্ষমতা ছেড়ে ভোটে অংশ নিয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। যদি এর অন্যথা করে তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকতে চান, তাহলে সেটি হবে শেখ হাসিনার কায়দা।

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তার কথামতো রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সময়ে নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা থেকে সসম্মানে বিদায় নেবেন। অন্যথায় উনি যত ভালো কাজই করুন না কেন, তার জন্য ভালো কিছু হবে না। এনসিপির জন্যও নয়।

কামরান রেজা চৌধুরী
ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও লেখক

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি আর্কাইভ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

- Advertisement -
spot_img

আলোচিত

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

ভিডিও