বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬

বৈষম্যময় পুরস্কার বান্ধব বাজেট

spot_img

ভিডিও

- Advertisement -

বাজেটে মদের দাম বাড়লে বলা হয় এখন দেবদাস হওয়াও কঠিন হবে! কিন্তু পার্বতীর বউ সাজতেও এবার কষ্ট হবে! বাজেটে লিপস্টিক সহ সাজসজ্জা দশ আইটেমের দাম বাড়ানো হয়েছে।
………বাজেট ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল


ফুল ও কলি নিয়ে প্রচলিত যে শের শায়রি তার সাথে বাজেটের একটা সম্পর্ক আছে। ফুল ও কলি নিয়ে শের শায়রিটা এমন-ফুল মানে যে কথা বলা হয়ে গেছে! কলি মানে যে কথা তোমাকে আজও বলা হয় নি! বাজেট হচ্ছে ফুল! আর বাজেট নিয়ে সব কথা আগেই বলে ফেলে মানুষ সেটা হচ্ছে কলি। বাজেটে যেমন ঘাটতি আছে তেমনি আছে সংকটও। খুব সাদামাটা ভাবে এটার ব্যাখ্যা করা যায়। ধরুন আপনি একটা ছবি বানাচ্ছেন। কিছু কাজ করার পর আপনি আর ছবির কাজ করতে পারছেন না। কারণ বাজেট সংকট। এরপর আবারও ছবির কাজ শুরু করলেন এবং নায়িকার নাচ ও গোসলের দৃশ্য ধারণ করার সময়ে নায়িকার সংক্ষিপ্ততম পোষাক দেখে কেউ যদি জানতে চায় ভাই নায়িকার পোষাক এমন কেন? উত্তর হবে-বাজেট ঘাটতি!

২০২৫ সালের বাজেট অবশ্য সামান্য ব্যতিক্রমী। কারণ এই প্রথম দেশে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায়। হয়তো সে কারণে মোটামুটি একটা নীরব বাজেট উপস্থাপিত হয়েছে! এই প্রথম সরকারি দলের লোকরা গণ মানুষের বাজেট শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় নামেনি। বিরোধীরা গরীব মারা বাজেট বলে রাস্তায় চীৎকার করেনি। বাজেট নিয়ে যা কিছু হয়েছে সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আগেও যে হতো না, তেমন না। চার বছর আগে যখন মুড়ির উপর ও কর্পোরেট কর কমানো হলো তখন আমরা লিখলাম-মুড়িবান্ধব করপোরেট বাজেট! এবার অবশ্য দুটো জিনিস খুব আলোচনায় এসেছে।

প্রথমে বলা হয়েছিল এবারের বাজেট নারীবান্ধব বাজেট। কীসের দাম কমার কারণে এমন বলা হচ্ছিলো সেটা পাঠকমাত্রই বুঝে নেবেন। পরে অবশ্য তারা নারীবান্ধব বাজেট বলা থেকে সরে এসেছেন। কারণ নারীদের লিপিস্টিক, আইলাইনারসহ মেকাপ আইটেমের মোট দশটির উপর কর বাড়ানো হয়েছে। নারীর সাজসজ্জার দাম এখন বাড়বে। একটা জনপ্রিয় গান নিয়ে অনেকেই সমস্যায় পড়তে পারেন। গানটা হচ্ছে-‘যদি বউ সাজোগো আরও সুন্দর লাগবে গো..!’ বউ সাজার আগে প্রতিবাদে নারীরা সাজসজ্জা বাদ দিতে পারেন। লিপিস্টিক দেয়ার পরিবর্তে পান খেয়েও ঠোঁট লাল করা যেতো। কিন্তু সমস্যা ঐ গানেই। গানে আছে-পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম বন্ধুভাগ্য হইলো না..এসব কারণে এই বাজেট আর যাই হোক নারীবান্ধব বাজেট না!

বন্ধু না জোটা কিন্তু খুব খারাপ! আর বলা হচ্ছে এবারের বাজেট পুরস্কাারবান্ধব বাজেট! এটা সত্য। নোবেল সহ মোট দশটা পুরস্কাারের টাকায় কোনো কর দিতে হবে না। পুরস্কারগুলো হচ্ছে র‍্যামন ম্যাগসেসে, বুকার, পুলিৎজার, সিমন বলিভার পুরস্কার এবং গ্র্যামি, এমি, অ্যকাডেমি, কান ও গোল্ডেন গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড। বাজেটে এই ঘোষণা পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়েছে। যেমন-

এক. ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় বসার পর ৬৬৬ কোটি টাকার কর মওকুফ করা হয়েছে। এটা না করে কী বাজেট পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেত না?

দুই. গ্রামীন ফোন খেকে নেয়া কর কী এখন ফেরত দিতে হবে?

তিন. কেউ যদি ভারতীয় কোনো পুরস্কার পান যার অর্থমূল্য আছে তিনি কেন এই করমুক্তি পাবেন না? একজন এ ব্যাপারে অভিনেত্রী জয়া আহসানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন!

চার. পাকিস্তান থেকে কেউ যদি এমন পুরস্কার বাগাতে পারেন তার কী করমুক্তি পাবার সম্ভাবনা একটু বেশি?

পাঁচ. পুরস্কার তো পুরস্কারই। আপনি নোবেল পেলে করমুক্তি পাবেন কিন্তু যে কোনো নামী আফ্রিকান অ্যাওয়ার্ড কী দোষ করলো? এটা কী পুরস্কার তথা করমুক্তির নামে বৈষম্য না?

আমরা কোনো প্রশ্নে না যাই। তার কারন প্রশ্ন থাকলে উত্তরও দিয়ে দিতে হবে। না হলে সেটাও বৈষম্যের পর্যায়ে পড়তে পারে। তাই প্রশ্ন ও তার উত্তর:

প্রশ্নঃ এবারের বাজেট কী পুঁজি বা নারীবান্ধব?
উত্তরঃ না। এবারের বাজেট সারীর সাজসজ্জা বিরোধী বা নারীবিদ্বেষী বাজেট। কারা সাজসজ্জা অপছন্দ করে তা খুঁজে বেরানোর দায়িত্ত্ব আমার না!

পরের তিনটি প্রশ্ন পুরোনো..

প্রশ্ন:শায়েস্তা খানকে মনে পড়ে কখন?
উত্তর: বাজেট এলে এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়লে! বাজেটে দাম কমলেও নাকি পন্যের দাম কমে না! শায়েস্তা খানের আমলে টাকায় আটমন চাল পাওয়া গেলেও মধ্যস্বত্ত্বভোগী বা মজুতদাররা ছিল না। থাকলে ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি তখনই প্রচলিত থাকতো!

প্রশ্ন: বাজেটে মানুষের দাম কতো কমলো?
উত্তর : গরীব মানুষদের নিয়ে কেউ গবেষণা করে না! আর বাজেট মানুষের জন্য বলা হলেও এটা কোন শ্রেনীর মানুষের জন্য সবাই তা জানে!

প্রশ্ন: বাজেট আসলে কী?
উত্তর: ছয় বছর আগে লিখেছিলাম। আবারও লিখলাম। বাজেট হচ্ছে বাজে ‘ট’! তাই সরকারের বাজেট ঘোষণার পর মানুষ খুঁজতে থাকে ভালো ‘ট’!

লেখাটা সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। তাই সিরিয়াস তথ্য দিয়ে কৌতুকের দিকে যাই। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭১-৭২ আর ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেট একসাথে দিয়েছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও স্বাধীনতার পর প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ। সেই বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। এবার (২০২৫) ৫৪তম বাজেট পেশ করা হলো। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত তাজউদ্দীন আহমেদই একমাত্র মানুষ যিনি পরিপূর্ণ রাজনীতিবিদ ছিলেন। এরপরে যারা অর্থমন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তারা অর্থনীতিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত আমলা বা ব্যবসায়ী ছিলেন, কেউ পরিপূর্ন রাজনীতিবিদ ছিলেন না!

এবার কৌতুক বলে বিদায় নেই। কৌতুক কমন পড়লে মন খারাপ করার কিছু নেই। প্রথমেই বলা হয়েছে বাজেট হচ্ছে ফুল মানে যার সব কথা আগেই বলা হয়ে গেছে!
এক ছেলে প্রার্থণায় বিধাতার কাছে শুধু টাকা চায়। মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা। কিন্তু কেউ তাকে টাকা দেয় না। একদিন সে একটা চিঠি লিখে পোস্ট অফিসে দিয়ে আসলো। এই চিঠি গেল অর্থমন্ত্রীর হাতে। তিনি ছেলেটার জন্য পচিশ হাজার টাকা বরাদ্দ দিলেন। টাকা পেয়ে ছেলেটা বিধাতার উদ্দেশ্যে আরেকটা চিঠি লিখলো। চিঠিতে এমন আর্জি ছিল- হে বিধাতা এবার সরাসরি আমার কাছে টাকা পাঠাবেন। অর্থ মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে পাঠালে ওনারা ট্যাক্স কেটে রাখে!

শেষের কৌতুকটা অন্যরকম। পাড়ার ক্লাবে স্থানীয় এক নেতা এসেছেন। তিনি বললেন-দুটো খবর আছে আপনাদের জন্য। একটা ভালো অন্যটা কঠিন। কোনটা আগে শুনবেন? সবাই ভালোটা শুনতে চাইলো। নেতা বললেন এক বছরের মধ্যে এই ক্লাব কয়েক তালা হবে। এসি, ফ্যান ও লাইট দিয়ে বেশ সুন্দর করা হবে ক্লাবটাকে। উপস্থিত সবাই এবার কঠিনটা জানতে চাইলো। নেতা বললেন-ক্লাব এর পুনঃনির্মান, সংস্কার ও সৌন্দর্য্য বর্ধনের টাকা আসলে আপনাদের পকেটেই আছে। যত তাড়াতাড়ি এটা আদায় হবে ক্লাব তত তাড়াড়াতাড়ি আধুনিক হবে!

বিশেষ দ্রষ্টব্য: মানুষ সহনশীল প্রাণী। তাদের অভিযোজন ক্ষমতা মারাত্মক। বাজেটে কোনো কিছুর দাম বাড়লে বিকল্প থুঁজুন। আলুর দাম বাড়লে ঢেঁড়স খাওয়া শুরু করেন। লিপিস্টিকের দাম বাড়লে পানের উপর নির্ভরশীল হন। পান খাওয়াও যায় ঠোঁটও লাল করে। পেয়াজের দাম বাড়লে পেয়াজ ছাড়া রান্না করুন। বাজেটে আপনার দাম বাড়লো না কমলো সেই ভাবনা থেকে দূরে খাকুন! বেঁচে থাকাটাই আসল।

আহসান কবির
সাংবাদিক ও রম্যলেখক

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি আর্কাইভ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

- Advertisement -
spot_img

আলোচিত

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

ভিডিও