একটি ভিন্ন বাস্তবতায় এ বছর পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হচ্ছে। একটি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গত বছরের আগস্ট মাসে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার তার দশ মাস অতিবাহিত করছে। দেশে এখনও পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফেরেনি। মব ভায়োলেন্সের মতো জনবিশৃঙ্খলা এখনও শত ভাগ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবাহ ছাড়া দেশের অর্থনীতির অন্যান্য সূচক যে খুব ভালো অবস্থায় রয়েছে, সেটি দাবি করা কঠিন। উপরন্তু জাতীয় নির্বাচনের দাবি ক্রমশই জোরালো হচ্ছে এবং এই বিষয়টি নিয়ে বিএনপিসহ আরও অনেক দলের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বাড়ছে। ফলে আগামী দিনগুলোয় দেশের অবস্থা কী হবে, তা নিয়ে জনমনে নানা শঙ্কা ও সংশয় রয়েছে। এরকম একটি পরিস্থিতিতে আজ সারা দেশে পালিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা।
মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা—যেটি মূলত কোরবানির ঈদ নামে পরিচিত। নামের মধ্যেই এই উৎসবের তাৎপর্য লুকিয়ে আছে। কোরবানি মানে ত্যাগ। মানুষের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু তার সম্পদ মহান আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করার নামই কোরবানি—যার শুরুটা হয়েছিল মুসলমানদের জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করার প্রতীকী ঘটনার মধ্য দিয়ে।
যদি সত্যিই হজরত ইব্রাহিমের (আ.) ছুরিতে প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.) কোরবানি হয়ে যেতেন, তাহলে মুসলমানদের জন্য ওই রীতি পালন করা সম্ভব হত না। মহান আল্লাহ সেই বাস্তবতা জানেন এবং সে কারণেই তিনি হজরত ইব্রাহিমকে (আ.) একটি বিরাট পরীক্ষায় ফেলে দেখতে চেয়েছিলেন তার আনুগত্য, মহান আল্লাহর ওপর তার ভরসা ও বিশ্বাস এবং সবচেয়ে প্রিয় ধন নিজের পুত্রকে স্রষ্টার জন্য উৎসর্গ করার অসীম শক্তি ও ধৈর্য। হজরত ইব্রাহিম (আ.) সেই আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন বলেই চোখ মেলে দেখলেন তার ছুরির নিচে নিজের সন্তান নয়, একটি পশু জবাই হয়ে গেছে।
মূলত এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ইসলাম যে বার্তাটি দেয় তা হলো, মানুষ যেন তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু, তার ধনসম্পদ মহান আল্লাহর পথে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকে। যেন সে সম্পদ আঁকড়ে না ধরে। কেননা আল্লাহর পথে সম্পদ খরচের অর্থ হলো সেটি সমাজের অভাবি মানুষের কাছে পৌঁছানো। এর মধ্য দিয়ে ইসলাম মূলত একটি বৈষম্যহীন তথা অর্থনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ, দারিদ্রমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে উৎসাহিত করে। ফলে কোরবানির ঈদ শুধুমাত্র পশু কোরবানি দিয়ে মাংস খাওয়ার উৎসব নয়, বরং সমাজের সেইসব মানুষের মাঝে মাংস বিতরণ করা, যাদের মাংস কেনার সামর্থ্য নেই বা কম।
কোরবানির পশুর মাংস তিন ভাগ করে এক ভাগ গরিবদের মাঝে, একভাগ আত্মীয়-স্বজনের মাঝে আর এক ভাগ নিজেদের খাওয়ার জন্য রাখার ব্যাপারে ইসলামের কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকলেও মুসলমানদের এই রেওয়াজটি এখন অলিখিত বিধানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশে এটা যৌক্তিক। ইউরোপ-আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের ধনী রাষ্ট্রগুলোয় কোরবানির এই নিয়ম চলে না। কারণ সেখানে এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, যারা বছরে এক কেজি মাংস কিনে খেতে পারেন না। যে কারণে দেখা যায়, পবিত্র হজের সময় হাজিরা মক্কায় যে লাখ লাখ পশু কোরবানি দেন, সেগুলো মূলত চলে যায় বিভিন্ন গরিব দেশে। বাংলাদেশেও একসময় সৌদি আরব থেকে প্রচুর দুম্বার মাংস আসত।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আর উটকে তোমাদের জন্য আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন করেছি। তোমাদের জন্য ওতে মঙ্গল রয়েছে। সুতরাং সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে ওদেরকে জবাই করার সময় তোমরা আল্লাহর নাম নাও। যখন ওরা কাত হয়ে পড়ে যায় তখন তোমরা তা থেকে খাও, আর খাওয়াও তাকে যে চায় না; আর যে চায় তাকেও। এভাবে আমি ওদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছি যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সুরা হজ, আয়াত ৩৭)
পরের আয়াতেই আল্লাহ বলছেন, ‘ওদের মাংস বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বরং আল্লাহর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া বা ধর্মনিষ্ঠা। এভাবে তিনি এদেরকে (পশু) তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা করো।’
তার মানে কোরবানির পশুর রক্ত মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। বরং তিনি এর মধ্য দিয়ে বান্দার তাকওয়া, আনুগত্য, একনিষ্ঠতা ও সম্পদের প্রতি তার মোহমুক্তির পরীক্ষা করেন।
সকলের ঈদ আনন্দময় হোক। পশু জবাইয়ের পরে এর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য আমরা সবাই যে যার দায়িত্বটুকু পালন করব এবং সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণ করে নাগরিকদের স্বস্তি দেবে—এই প্রত্যাশা।
সম্পাদক
ভিন্ন বাস্তবতায় এ বছরের কোরবানি
- Advertisement -





