শুক্রবার, জুন ১২, ২০২৬

সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কার কেন জরুরি?

spot_img

ভিডিও

- Advertisement -

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ওপর তাদের অভ্যন্তরীণ সংস্কার খতিয়ে দেখার জন্য যে ধারাবাহিক চাপ তৈরি হয়েছে, সেটি বিগত ১৫ বছরে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা সংগঠিত রাজনৈতিক, নিরাপত্তা, সামাজিক এবং শাসন-সম্পর্কিত অপকর্মের সংমিশ্রণ থেকে উদ্ভূত। এই চলমান চাপের মূল কারণগুলো এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

১. রাজনৈতিক প্রভাব ও তদারকি: বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ঐতিহাসিকভাবে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে অতীতের সামরিক অভ্যুত্থান এবং সামরিক এলিটদের রাজনৈতিক আধিপত্য। দেশে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু থাকা সত্ত্বেও জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামরিক বাহিনী পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা পালন করে চলেছে। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের সাথে রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ততা মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সমাজে রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা হ্রাস করার জন্য প্রায়শই সামরিক বাহিনীতে সংস্কারের দাবি উঠছে। রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ একটি সংবেদনশীল ও চলমান বিষয়।

২. উন্নত পেশাদারিত্ব ও আধুনিকীকরণ: বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা পরিবেশ ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে তার প্রাথমিক দ্বায়িত্ব দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখার জন্য সাইবার হুমকি, সন্ত্রাসবাদ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জসহ উদীয়মান হুমকির প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম থাকতে হবে। নতুন প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি এবং সাংগঠনিক কাঠামো গ্রহণ করে সামরিক বাহিনীর ওপর  আধুনিকীকরণের চাপ রয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখতে সংস্কার প্রয়োজন। পক্ষান্তরে সামরিক বাহিনীকে আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানো (জাতীয় পার্টির জিএম কাদেরকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে জোর করে মনোনয়ন দাখিলে বাধ্য করা) থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ সামরিক বাহিনীর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পক্ষে এই ধরনের রাজনৈতিক মাখামাখি তাদের কর্তা ব্যক্তিদের মূল দ্বায়িত্ব পালনে অমনোযোগী হয়ে সকল বাহিনীকে শুধুমাত্র একটি সিরিমোনিয়াল বাহিনীতে পরিণত করে দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির সম্মুখিন করে তুলেছে।

৩. জবাবদিহি ও মানবাধিকার: নাগরিক অস্থিরতা মোকাবিলা থেকে শুরু করে মানবাধিকার লঙ্ঘন পর্যন্ত বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সামরিক বাহিনীর জড়িত থাকার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে সংস্কারের দাবি বেড়েছে, যা সেনাবাহিনীকে জনসাধারণ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসমূহের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আজ দেশপ্রেমিক সামরিক বাহিনীকে তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী, অসৎ ও বিতর্কিত সদস্যদের কর্মকাণ্ডের কারণে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়াছে। তাই সামরিক বাহিনীকে কলুষমুক্ত করতে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিগত আট মাসে সামরিক বাহিনীর কর্তৃপক্ষ তাদের রাঘববোয়াল অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে—যার দায় সামরিক বাহিনীর বর্তমান নেতৃত্ব এড়াতে পারবে না। সামরিক বাহিনীর আভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা উন্নত করা, অপব্যবহার কমানো এবং আইনি ও নৈতিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করার চাপ সেনাবাহিনীর বৈধতা এবং জনসাধারণের আস্থা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা সামরিক বাহিনীর মধ্যে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।

৪. অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ ও দুর্নীতি: বাংলাদেশের অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো সামরিক বাহিনীও দুর্নীতি ও অদক্ষতা-সম্পর্কিত সমস্যা থেকে মুক্ত নয়। কার্যক্রমকে সুবিন্যস্ত করতে, অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে এবং পদমর্যাদার মধ্যে দুর্নীতি দমন করতে প্রয়োজনীয় জবাবদিহির পদ্ধতি চালু করার তাগিদ বেড়েছে। এটি একটি আবশ্যকীয় সংস্কার চাহিদা। সুতরাং সশস্ত্র বাহিনীকে তাদের কার্যকারিতা এবং সুনাম বাড়ানোর জন্য অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মধ্য দিয়ে যেতে দিনের পর দিন চাপ বেড়ে চলেছে।

৫. অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তাকে সামরিক বাহিনীর প্রযুক্তিগত ও সক্ষমতা বাড়নোর পরিকল্পনা করতে হয় এবং দেশের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার সকল ব্যয় মিটাতে হয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক সামরিক প্রতিপক্ষকে সামলানোর জন্য সামরিক খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের ক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলেছে। ফলস্বরূপ সশস্ত্র বাহিনীর ওপর তাদের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, অপচয় হ্রাস এবং তাদের কর্মক্ষম দক্ষতা সর্বাধিক করার চাপ রয়েছে। সম্পদ বরাদ্দ উন্নত করা, অপ্রয়োজনীয় (বিউটিফিকেশন ও চাকচিক্য) ব্যয় হ্রাস করা এবং উপলব্ধ প্রযুক্তির আরও ভাল ব্যবহারের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারের চাপ চলমান দাবির অংশ।

৬. আঞ্চলিক নিরাপত্তা গতিশীলতা: দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে উত্তেজনা এবং একাধিক ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল। এই বহিরাগত চাপের মুখোমুখি হওয়ার জন্য, বিশেষ করে ভারত, মায়ানমার এবং চীনের মতো দেশগুলোর সাথে কৌশলগত ভারসাম্য ও প্রস্তুতি বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে অত্যন্ত চৌকষ, ভবিষ্যতমুখী পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা গতিশীলতা মোকাবিলায় আধুনিকীকরণ এবং কৌশলগত সংস্কার প্রয়োজন।

৭. জনসাধারণের ধারণা ও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল: জাতীয় ঐক্য এবং দেশের নিরাপত্তা কৌশলের জন্য সেনাবাহিনীর প্রতি জনসাধারণের আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় স্বার্থের সাথে আরও ঘনিষ্ঠভাবে একাত্মতা দেখানো এবং এর কার্যক্রমে জনগণের আরও বাস্তব অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সংস্কারের লক্ষ্য হলো সামরিক বাহিনীকে জনগণের সাথে একাত্ম হয়ে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম ভাবমূর্তি উন্নত করা, জনসাধারণের আস্থা জোরদার করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা।

পরিশেষে, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কারের জন্য ক্রমাগত চাপ আধুনিকীকরণ, জবাবদিহি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যের খাতিরেই প্রয়োজন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্যই সামরিক বাহিনীতে সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম জিয়াউল হাসান
আর সি ডি এস, পি এস সি (অব.)

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি আর্কাইভ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

- Advertisement -
spot_img

আলোচিত

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

ভিডিও