শুক্রবার, অক্টোবর ১৬, ২০২৬

সৌরবিদ্যুতে বড় পরিকল্পনা সরকারের, বড় বাধা জমি

spot_img

ভিডিও

- Advertisement -

বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ব্যয়। এই চাপ সামলাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকেই আসবে বড় অংশ। কিন্তু পরিকল্পনার তুলনায় বাস্তবায়নের পথ সহজ নয়। বিশেষ করে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমির সংস্থানই এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বায়ু, বর্জ্য, পানি, ভাসমান সৌর ও এগ্রিভোলটাইকসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এই পরিকল্পনার পেছনে রয়েছে বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদা ও জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ২৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে সম্প্রতি সংসদে জানানো হয়েছে। চাহিদা মেটাতে শুধু আমদানিকৃত গ্যাস, কয়লা বা তেলনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়বে। তাই দেশীয় ও নবায়নযোগ্য উৎস কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।

জমিই বড় প্রশ্ন: সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো জ্বালানি হিসেবে সূর্যের আলো বিনামূল্যে পাওয়া যায়। তবে বড় আকারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হয় বিস্তীর্ণ জমি। এক মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে প্রায় আড়াই থেকে তিন একর জমির প্রয়োজন হয়। ফলে হাজার হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জমির প্রয়োজনীয়তা দাঁড়ায় বিপুল পরিমাণে।

বাংলাদেশের সীমিত ভূমি, ঘনবসতি এবং কৃষিজমির ওপর চাপের কারণে নতুন করে বড় জমি সংগ্রহ করা সহজ নয়। বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জমি কিনে প্রকল্প করতে হলে প্রকল্প ব্যয় বাড়বে। সেই সঙ্গে জমির দাম বেড়ে গেলে উৎপাদিত বিদ্যুতের দামও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

এ কারণে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সরকারি জমি ব্যবহারের দিকে নজর দিচ্ছে সরকার। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের অব্যবহৃত বা পতিত জমির তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রায় ৬০ হাজার একর জমির তথ্য পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উপযোগী জমি চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব জমি ব্যবহার করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। তবে শুধু জমি থাকলেই হবে না; প্রকল্প এলাকায় সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ দ্রুত জাতীয় গ্রিডে নেওয়ার সুযোগ না থাকলে বড় প্রকল্প করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।

বড় প্রকল্পে এগোচ্ছে সরকার: জমির সংকটের মধ্যেই বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোগও চলছে। রামপালে ৪৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের ‘বি’ ব্লকে প্রায় ৬৮৫ একর জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল ও পিডিবির নিজস্ব অর্থায়ন মিলিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে কেন্দ্রটি উৎপাদনে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া মাতারবাড়ী কোল পাওয়ার প্রকল্পের অ্যাশ পন্ডের জায়গা ব্যবহার করে ৭০ মেগাওয়াটের আরেকটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডি ও পরামর্শক নিয়োগের কাজ এগিয়েছে। অর্থায়নে রয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ ধরনের উদ্যোগে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নতুন করে কৃষিজমি বা বসতভিটা ব্যবহারের প্রয়োজন কমে আসে।

ছাদে সৌরবিদ্যুতের বড় সম্ভাবনা: ভূমিভিত্তিক প্রকল্পের পাশাপাশি রুফটপ সোলারকে দ্রুত সম্প্রসারণের পথ হিসেবে দেখছে সরকার। বাড়ি, শিল্পকারখানা, অফিস ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে নতুন জমির প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ছাদগুলোকে কাজে লাগানো গেলে একসঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

নেট মিটারিং ব্যবস্থায় নিজস্ব ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ রয়েছে। এ ব্যবস্থাকে আরও আকর্ষণীয় করতে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য বিশেষ প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহকারী নির্দিষ্ট গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কেনার সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে একদিকে গ্রাহক নিজের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারবেন, অন্যদিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে আর্থিক সুবিধাও পাবেন।

সংসদেও সৌরবিদ্যুতের পরিকল্পনা: সরকারের সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনা শুধু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বা শিল্পকারখানায় সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। জাতীয় সংসদের বিদ্যুৎ চাহিদাও ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদ ও খালি জায়গা ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে চাইছে সরকার।

এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানানো হয়েছে। এতে বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি পর্যায়েও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

জমির বাইরেও চ্যালেঞ্জ: বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে শুধু জমির সংকটকে দায়ী করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রকল্প অনুমোদনের গতি, অর্থায়ন, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং গ্রিড অবকাঠামো সবগুলো বিষয় একসঙ্গে কাজ করে।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদের মতে, সৌরবিদ্যুতের প্রসার পিছিয়ে থাকার কারণ শুধু জমির সংকট নয়; নীতি ও বাস্তবায়নের ঘাটতিও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, সৌরবিদ্যুৎ খাতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তরিকতা ও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি জমি, শিল্পকারখানার ছাদ, অব্যবহৃত শিল্পাঞ্চল ও অন্যান্য অনুপযোগী জমিকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে সঞ্চালন অবকাঠামো আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা গেলে নতুন প্রকল্প দ্রুত গ্রিডে যুক্ত করা যাবে।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা: ২০৩০ সালের লক্ষ্য পূরণে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নে দ্রুত যাওয়া। প্রকল্প নেওয়া, জমি নির্ধারণ, অর্থায়ন, অনুমোদন, গ্রিড সংযোগ ও নির্মাণ প্রতিটি ধাপে দীর্ঘসূত্রতা হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা তৈরি করা কঠিন হবে।

সরকার সৌরবিদ্যুৎকে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর অন্যতম উপায় হিসেবে দেখছে। বড় প্রকল্পের পাশাপাশি রুফটপ সোলার, সরকারি জমি ব্যবহার এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ সেই পরিকল্পনারই অংশ। এখন এসব উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে ২০৩০ সালের লক্ষ্য কতটা অর্জন সম্ভব হবে।

কারণ সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বাংলাদেশে কম নয়; চ্যালেঞ্জ হলো সেই সম্ভাবনাকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে রূপ দেওয়ার জন্য জমি, গ্রিড, বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তাকে একই গতিতে এগিয়ে নেওয়া।

- Advertisement -
spot_img

আলোচিত

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ

ভিডিও